প্রতিবছর নিয়মিত দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হলেও বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঋণ বাড়ছেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গত প্রায় ১৫ মাসে (জুলাই ২০২৫-সেপ্টেম্বর ২০২৬) দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
অতি সম্প্রতি এ হিসাব চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব মতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বা ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি) ঋণ স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫)-এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ হিসাব মতে, সরকারের মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৫৬ শতাংশ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ এবং অবশিষ্ট ৪৪ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ৬৫ শতাংশ নেওয়া হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ২৮ শতাংশ এবং জিপিএফ তহবিল থেকে ৭ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পুঞ্জিভূত স্থিতি ছিল মোট ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।
সরকারের পুঞ্জিভূত ব্যাংক ঋণের মধ্যে ট্রেজারি বন্ড ও স্পেশাল ট্রেজারি বন্ড থেকে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ট্রেজারি বিল থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২২ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৭ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা ও ‘সুকুক’ থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে গৃহীত পুঞ্জিভূত ঋণ স্থিতি সামান্য কমেছে। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে সরকারের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা। আর গত সেপ্টেম্বর শেষে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এ খাতে পুঞ্জিভূত ঋণ কমেছে ৪৯৮ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংক-বহির্ভূত খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি কমলেও গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সঞ্চয়পত্র খাতে পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে পুঞ্জিভূত ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২২ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এ খাতে সরকারের ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণের হিসাবে অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য
সরকারের পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে বিগত সরকারের আমলের মত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও বড় ধরনের পার্থক্য বিদ্যমান। এর পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকার অধিক (প্রায় ১ হাজার ৪৫২ কোটি ডলার)।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এর আগে গত জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর হিসাব মতে, গত সেপ্টেম্বর শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি হচ্ছে ৯ হাজার ২৫৪ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ২৯ হাজার ২০ কোটি টাকা। এটি অর্থ বিভাগ-এর পরিসংখ্যানের তুলনায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগ-এর মতে, সরকারের ঋণ বাড়লেও এটি এখনো ঝুঁকিসীমার নীচে রয়েছে। বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ-রফতানি অনুপাত ১৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টি
অর্থ বিভাগ বলছে, সরকারের এ পুঞ্জিভূত ঋণ হিসাবের বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি গৃহীত ঋণের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত সার্বভৌম গ্যারান্টি বা দায় রয়েছে। গত জুন শেষে এ ধরনের গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৬৬ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। গত ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারের দেশি-বিদেশি মোট গ্যারান্টির স্থিতি ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে গ্যারান্টির পরিমাণ কমেছে।