Image description

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল—‘নতুন বন্দোবস্ত’ বা সংস্কার, অর্থনৈতিক কাঠামো পুনরুদ্ধারসহ আরও কিছু ব্যাখ্যা সেখানে থাকলেও নির্বাচনি প্রচারণাকালে দেখা মিলছে সেই পুরোনো বন্দোবস্তের—সেই পুরোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, সেই রাস্তা বন্ধ করে মিছিল মিটিং, ফুটপাত বন্ধ করে নির্বাচনি প্রচারণা বুথ, সেই হানাহানি, সেই পারস্পরিক কটূক্তির বন্যা।

প্রচারণা শুরুর ১০ দিনের মাথায় বড় দুই দলের শীর্ষ নেতারা ছুটছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জনসভায় দেশ নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা জানানোর পাশাপাশি করছেন প্রতিপক্ষের সমালোচনা। যদিও মুখে বলছেন—সমালোচনা না করে তারা শান্তি ঐক্য চান। এই পুরোনো প্রচারণার ধরনে কেবল পুরোনো দলগুলোই যে পড়েছে তা নয়, এর মধ্যে নতুনদেরও একই রকমের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

তর্ক রূপ নিয়েছে কটূক্তিতে

প্রচারণার শুরু থেকে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতিকে সমালোচনা করছে জামায়াতের ১১ দলীয় জোট। আর বিএনপির পক্ষ থেকে কখনও ৭১-এর ভূমিকা, কখনও ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা চলছে। নির্বাচন পর্যালোচকরা বলছেন, এটা কেবল সমালোচনার জায়গায় থাকলে ভালো। ব্যক্তিগত আক্রমণে গেলে সেটা সেই পুরোনো নিয়মেও ফিরে যাওয়া হবে। ৩০ জানুয়ারি কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে জামায়াতের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, ‘‘ঘরে ঘরে এখন কার্ড বিতরণ হচ্ছে, নাম তার ফ্যামিলি কার্ড। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে মায়ের হাতে, বাবার হাতে না। কী চমৎকার! এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড, আরেক হাতে মায়ের গায়ে হাত। বাংলাদেশের মানুষকে এত বোকা মনে করেছেন? সবাই নিজের বুঝটা ভালো করেই বোঝে। আমার মায়েরা এখন ওপেনলি বলেন, তারা এই অনিরাপদ বাংলাদেশ আর দেখতে চান না, তারা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চান। মায়েরা মনে করেন, দাঁড়িপাল্লা আর তার সঙ্গীরাই তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে।’’

এর আগে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর ঝিনাইদহে নাকি চাঁদার রেট বেড়ে গেছে। যারা চাঁদাবাজি করেন তাদের লজ্জা হওয়া উচিত। কারণ একজন মানুষ খেটে খেটে টাকা উপার্জন করেন, আর আপনারা তাতে ভাগ বসান।’’

গত ২৯ জানুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সতর্ক করে বলেন, ‘‘এক স্বৈরাচারকে হটিয়ে নতুন স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় বসাতে চাই না। চাঁদাবাজির রাজনীতির কাছে দেশের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’’

একের পর এক সমালোচনার মুখে রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘‘আমরা ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে যেতে চাই না। আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে কারও সমালোচনা করছি না। কারণ আমি যদি সমালোচনা করি, আপনাদের কোনও লাভ হবে? আপনাদের পেট ভরবে? আপনাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে? আপনাদের কৃষিঋণ মওকুফ হবে?’’

প্রতিপক্ষ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বাড়ছে সংঘর্ষ

প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে দলের অভ্যন্তরে ও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে। প্রচারণাকে ঘিরে সামান্য এদিক-সেদিক হলেই মারামারি করে পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ৩১ জানুয়ারি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে জামায়াতের ইউনিয়ন আমিরসহ ১০ জন ও বিএনপির ৫ কর্মী আহত হয়েছেন। এর আগের দিন ভোলা-৩ আসনের লালমোহনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং নির্বাচনি প্রচারে বাধা দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত সাত জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় দুই পক্ষের নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে প্রথমে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। নির্বাচনি প্রচারণার সাতদিনের মাথায় শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ঝিনাইগাতী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ ধরনের সহিংসতা, সংঘর্ষে ব্যাপক আহতের খবর আসছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসের ১ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং কমপক্ষে ৬১৬ জন আহত হয়েছেন।

২১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪১৪ জন।

প্রার্থীরা কী করতে পারবে না কিন্তু করছেন

আচরণবিধি অনুযায়ী বেশ কিছু বিষয় এবার প্রার্থীদের মেনে চলতে হবে। তার মধ্যে আছে— জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, এমন কোনও সড়ক বা জনপথে সভা-সমাবেশ করা যাবে না। এছাড়া, দেশের বাইরে বা বিদেশের মাটিতে কোনও নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন বক্তব্য, নারী, সংখ্যালঘু বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনও কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে প্রার্থীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডার মতো উপাসনালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনও নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। গত ১০ দিনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় বড় জনসভাগুলোতেও এর অনেক কিছুই মেনে চলা হচ্ছে না। এমনকি যেহেতু ব্যানারের মাপও দিয়ে দেওয়া আছে, প্রার্থীরা ওই মাপের ব্যানার বানিয়ে পাশাপাশি রেখে বড় ব্যানার আকারে এলাকা ছেয়ে ফেলেছেন।

ঢাকা-৮ আসনে দ্বন্দ্ব বেশি

ঢাকায় নির্বাচনি মাঠ গরম করে রেখেছে ঢাকা-৮। প্রতিদিন কোনও না কোনও ইস্যুতে প্রধান দুই প্রার্থীর তর্কালাপ চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি ঘটনাও ঘটেছে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর সঙ্গে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ করাকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা ছিল। এর আগে প্রচারণা শুরুর দ্বিতীয় দিনেই রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী রোডের মৌচাক এলাকার একটি গলিতে পথসভা চলাকালে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর নোংরা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এদিকে তার ওপর এসব হামলা কে ঘটাচ্ছে—সেই ইঙ্গিত করে পাটওয়ারী বক্তৃতা করলেও এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস এক কথায় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। এ সময় পাটওয়ারীর উদ্দেশে তিনি কিছু ‘হাস্যরসাত্মক’ শব্দচয়নও করেছেন। উল্টোদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন।

পারস্পরিক তর্কের বিষয়গুলো ব্যক্তিগত আক্রমণের জায়গায় চলে যেন না যায়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও উদ্যোগ আছে কিনা প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচনকেন্দ্রিক কিছু সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে এর জন্য বিএনপিকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক নয়। যেকোনও সংঘাতের বিপক্ষে আমাদের অবস্থান। আমরা শুরুতেই নেতাকর্মীদের কোনও উসকানিতে পা না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে আসছি।’’