ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জোরালো হয়ে উঠছে প্রার্থীদের প্রচারণা। দিনভর প্রার্থীরা গণসংযোগ, মিছিল, মিটিং ও সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব প্রচারণায় উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে চলছে একে অন্যের প্রতি বিষোদগার।
প্রার্থীদের নিয়ে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, কোনও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনও ব্যক্তি নির্বাচনি প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন এবং আক্রমণাত্মক বা ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করিয়া বক্তব্য প্রদান বা কোনও ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনও বক্তব্য দিতে পারবেন না। তবে আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না প্রার্থীরা।
তিনি আরও বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি, গুলিস্তানে এরই মধ্যে সব হকিস্টিক ও স্ট্যাম্প বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। তারা যে পথেই আসুক, তাদের মোকাবিলায় আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আমরা নিজেরা আইন হাতে তুলে নেবো না। বরং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু ছেলেপেলে আছে হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ, লম্বা লম্বা কথা বলে। ঘুম থেকে উঠেই আল্লাহর নাম নেয় কিনা তার খবর নেই, আমার নাম নিয়ে শুরু করে। কাজ নাই মির্জা আব্বাসকে বকা দেওয়া ছাড়া। এলাকার মানুষ আমাকে চেনে, ব্যবসায়ীরা আমাকে চেনে, ঢাকা-৮ ব্যবসায়ী জোন, ওই বিশেষ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ বলতে পারবে না মির্জা আব্বাসকে কেউ এক কাপ চা খাওয়াতে পেরেছে। শেখ হাসিনার হাত থেকে যেমন দেশকে রক্ষা করা হয়েছে সেরকম এসব অর্বাচীন বালকদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।”
এদিকে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নওগাঁ, রাজশাহী ও বগুড়া সফর করছেন। গত ২৯ জানুয়ারি নওগাঁয় নির্বাচনি সভা শেষে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। শনিবার বগুড়া জেলা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সিরাজগঞ্জের জনসভার উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। বিকালে জনসভায় তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে যারা এসে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের দেখামাত্রই ‘গুপ্ত’ বলবেন। আপনাদেরকে অনেকেই এসে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা এসে আপনাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদেরকে বলবেন ‘গুপ্ত’ তোমরা। পারবেন বলতে?”
অন্যদিকে, আজ কুমিল্লায় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি দলের নাম উল্লেখ না করে বলেন, “জাতিকে আর কষ্ট দিয়েন না। একসময় আপনারাও মজলুম ছিলেন। এখন কেন জালিম হচ্ছেন? আমরা আশা করি, আপনারা সংশোধন হবেন। যারা সংশোধন হবেন, তাদের বুকে টেনে নেবো। যারা হবেন না, তাদের প্রতি আমাদের কঠোর হতে হবে।”
একই সভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও ঢাকা-১৩ আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “একটি দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলে, গোপনে ‘না’ এর জন্য প্রচারণা চালায়। কেউ প্রকাশ্যে এক কথা আর গোপনে আরেক কথা বললে তাকে কি বলা যায়? তারা নিজেদের ঘৃণ্য পরাজয় দেখতে পেয়ে ভীরু কাপুরুষের মতো নারীদের গায়ে হাত তোলার মতো ঘৃণ্য কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ যদি আমার মায়ের দিকে, বোনের দিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকায়, কেউ যদি মেয়েদের হিজাব নিয়ে টানাটানি করে, আপনারা তার হাত ভেঙে দেবেন, চোখ উপড়ে দেবেন। আর কোনও মুনাফেক গোষ্ঠী বাংলাদেশ শাসন করতে পারবে না। বাংলার মানুষ আর তাদের মেনে নেবে না।”
শনিবার সকালে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর দেশ পরিচালনায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এই তিনটি দল লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবারের নির্বাচনে এই তিন দলকে না বলতে হবে। নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল দেখা শেষ। এবার জনগণ পরিবর্তন চায়।”
একই দিনে বিএনপি মহাসচিব শনিবার ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনি গণসংযোগ চলাকালে বলেন, “ওই দলকে বিশ্বাস করা যায় না, যারা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এই দেশে যারা ধর্মকে ভিত্তি করে রাজনীতি করে তাদের আমরা প্রশ্রয় দিতে চাই না।”
দু’দলের সংঘর্ষ
এদিকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুলাইপত্তন গ্রামের চৌকিদার বাড়িতে হওয়া এ ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। এই ঘটনার জন্য একে অপরকে দুষছে দল দু’টির নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। দুপুরের দিকে এ ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার প্রতিবাদে বিকালে পৌর শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন জামায়াতের নারী সদস্যরা।
যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
পারস্পরিক দোষারোপের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতৃত্ব একে-অপরের ব্যাপারে যেভাবে কথা বলছে, সেটাও আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে যায়। এটা না হলে ভালো ছিল। যদিও এরকম ঘটনা সামান্য, কিন্তু এই সামান্যও তো হতে পারে না। আমাদের তো চেঞ্জ হতে হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি হচ্ছে, এটা যদি সহিংসতার রূপ নেয় সামান্য হলেও, এটাকে খুব সিরিয়াসলি দেখতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলেই পরিবেশটা আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠবে।’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘প্রচারণায় প্রত্যেকেই চাইবে তার প্রতিদ্বন্দ্বিকে ঘায়েল করতে। কিন্তু এটা যেন সীমা অতিক্রম না করে যায়। ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করার মতো বক্তব্য দেওয়া আসলে মোটেই সমীচীন না। আমার মনে হয় প্রচারণায় ধর্মীয় বিষয়ের ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের খুব কঠিন হওয়া দরকার।’’