Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর ১১ দিন বাকি। চলছে জোর প্রচারণা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা। ২৪- এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে হতে যাওয়া এই নির্বাচনে এবার অনেক কিছু ব্যতিক্রম। নতুনত্ব এসেছে প্রচারে। প্রতিশ্রুতি, প্রচার কৌশলে ডিজিটাল মাধ্যমের জয়জয়কার। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর মুক্ত পরিবেশে হতে যাওয়া এই নির্বাচনে যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন বিষয় আর ইস্যু। যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে আগে হয়নি। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথমবারের মতো নির্বাচনী বাসে চলাচল করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকেও প্রচারণা বাসের উদ্বোধন করা হয়। এবারই প্রায় সব দল নিয়ে নির্বাচন হলেও নির্বাচন করতে পারছে না সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল। 

অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতা গ্রহণ করলেও তাদের অধীনে পরের তিনটি জাতীয় নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ তিনটি নির্বাচনই ছিল দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ‘একতরফা’। এর মধ্যে কোনোটি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’, কোনোটি ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ আবার কোনোটি ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে দেশে। এবার জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়া সরকারের প্রধান কার্যাবলীর মধ্যে ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়া। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আদলেই হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। যদিও নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী তা স্পষ্ট নয়। যদিও সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের একটি খসড়া তৈরি করেছে। যা গণভোটে জুলাই সনদে চূড়ান্ত হবে। 
 

নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ: দেশে এখন পর্যন্ত হওয়া নির্বাচনগুলোতে প্রথমবারের মতো দল হিসেবে নিবন্ধন নেই আওয়ামী লীগের। ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি। যদিও ১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সেটি বর্জন করে। নির্বাচনে তখন জাতীয় পার্টিসহ মাত্র ছয়টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে নির্বাচনে নেই দলটি। 
 

খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন: রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকে দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অন্যতম চরিত্র ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এবারো নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। গত ৩০শে ডিসেম্বর তার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। তিনিই এবার বিএনপি’র নির্বাচনী যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। 

জোটে নিজ দলের প্রতীকে ভোট বাধ্যতামূলক: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) পরিবর্তন এসেছে এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে। এতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জোটগতভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান যুক্ত করাসহ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়। ভোটের সময় অনেকে জোটভুক্ত হলেও জনপ্রিয় বা বড় দলের মার্কায় ভোট করতেন। সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে এ সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে এ সুপারিশ আমলে নেয়া হয়। অবশেষে সে সুযোগ বন্ধ করা হয় আরপিও (২০ ধারা) সংশোধনের মাধ্যমে। ফলে এবার জোটে থাকা কয়েকটি দলের প্রধান দল ত্যাগ করে জনপ্রিয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। আবার কেউ কেউ জোটের প্রার্থী হয়েও নিজ দলের প্রতীকে লড়ছেন। এ নিয়ে দুই জোটেই কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।

ইভিএম নেই: নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহারের আইন বাতিল করার সুপারিশ করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হয়েছিল যে ছয় আসনে, তার ভোটার উপস্থিতির হার এবং ব্যালট পেপার ব্যবহার করা আসনগুলোর ভোটার উপস্থিতির হারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। ফলে এ পার্থক্য নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ভোটের হার নিয়ে সন্দেহ এবং বিতর্কের জন্ম দেয়।

ডিজিটাল মাধ্যম ও এআই’র ব্যবহার: এবারের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। এটি সারা দুনিয়ায় এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইআই’র ব্যবহার এবারের নির্বাচনে নতুন এবং বড় ঝুঁকির কারণ। প্রচার-প্রচারণায় প্রার্থীদের জন্য এটি সমস্যা তৈরি করছে। এ ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার, আচরণবিধি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশন এখনো সক্ষমতার জায়গায় নেই। যদিও বিষয়টি এবার আরপিওতে সংযোজন করা হয়েছে। 
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, এবারের নির্বাচনে গণভোট হচ্ছে আলাদা। তাছাড়া যারা এতো বছর পর্যন্ত দেশ শাসন করেছে, স্বৈরতন্ত্র চালিয়েছে তারা নির্বাচনে নেই। কতোগুলো সংস্কারের আলোকে এবার নির্বাচন হচ্ছে। বস্তুত এটা ফাউন্ডেশন নির্বাচন। যার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিক সুচিত করার সুযোগ হচ্ছে। এতো বছর যে জালিয়াতির নির্বাচন হয়েছে এবার তা হবে না।