সবার শেষে মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছিল আরিফুল হক চৌধুরীর। তিনি সিলেট-৪ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী। নগরের দু’বারের সাবেক মেয়র। সংসদ নির্বাচনে নামবেন কিনা- এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তবে তার জন্য উন্মুখ হয়ে বসেছিলেন আসনের ভোটাররা। আরিফ শেষ মুহূর্তে হতাশ করলেন না। মৃত্যুর আগে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার হাত থেকেই নিলেন বিএনপি’র টিকিট। এরপর নামলেন ভোটের মাঠে। যদিও আসনটি তার চেনা। ‘গ্যাপ’ ছিল দীর্ঘ দিনের। বন্ধু হাকিম চৌধুরী প্রতিরোধের দেয়াল তুলেছিলেন। কিন্তু আরিফ তো আরিফই। নেমেই ঘোষণা দিলেন সুর তুলতে তিনদিন লাগবে। তার কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তিন উপজেলায় তিনদিনের সফর। এতেই তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে। বন্ধু হাকিমও বশে আসলেন। শুধু আসলেনই না চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। বিএনপি’র ভেতরেই নেই কোনো দূরত্ব। যতই দিন যাচ্ছে একজোট হয়ে ভোটের মাঠে নামছেন কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের নেতাকর্মীরা।
বাস্তব অবস্থা হচ্ছে প্রচারণায় আরিফের ধারে কাছেও কেউ নেই। বয়স তো কম হয়নি। ষাট পেরিয়েছে অনেক আগেই। তবুও যুবক আরিফুল হক চৌধুরী। তার কাছে দিন নেই, রাত নেই- ছুটছেন তো ছুটছেনই। বসবাস করেন সিলেট নগরে। প্রতিদিন সকাল হতেই বেরিয়ে যান। আর ফিরেন মধ্যরাতে। ফজরের নামাজের পর যখন ঘুম ভাঙে তখনো তার ড্রয়িং রুম সরব থাকে। নির্বাচনী এলাকার জনগণ ভোর থেকেই বসে থাকেন বাসায়। নানা সমস্যা। ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা। মধ্যরাতে যখন বাসায় ফিরেন তখনো তার ড্রয়িংরুম সরব। কথা বলার জন্য নির্বাচনী এলাকার মানুষ বসে থাকেন। তাদের সময় দিয়েই বাসায় ঢুকেন আরিফ। সিলেট থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এসেছিলেন ২১শে জানুয়ারি। ২২শে জানুয়ারি সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশ করেন।
সমাবেশের আগের রাতে সিলেটেও ম্যাজিক দেখালেন আরিফুল হক চৌধুরী। মধ্যরাতের পর নগরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল। ওরা কেউ শহরের নয়। গ্রামের কর্মীরা। ধানের শীষ, ধানের শীষ স্লোগানে মুখর মাদ্রাসা মাঠের আশপাশ। ওরা এসেছেন জৈন্তা, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট থেকে। সকালে সমাবেশ। এসে যোগ দেয়া সম্ভব হবে না। রাতেই তারা ছুটে আসেন সিলেট নগরে। সিলেটের সমাবেশের দাওয়াতে আরিফ এগিয়ে ছিলেন। নির্বাচনী এলাকার যেখানে গেছেন সেখানেই দাওয়াত দিয়েছেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে দলে দলে লোকজন এসে শরিক হয়েছেন সমাবেশে।
সিলেটের সবচেয়ে অবহেলিত আসন বলা হয় সিলেট-৪ কে। নগর এখন উন্নত জনপদ। সেটি হয়েছে মেয়র আরিফের হাত ধরেই। ফলে অবহেলিত আসনে উন্নয়নের বাতি জ্বালানো এখন আরিফের প্রধান কাজ। ইতিমধ্যে এলাকার উন্নয়নে নানা অভিযোগ তুলেছেন আরিফ। এ অভিযোগ গেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের টেবিল পর্যন্ত। আরিফ ঘুরছেন গ্রামে গ্রামে। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকায়। আবার কখনো কখনো বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে। এই সাঁকোকে ভয় পান আরিফ। এক সময় এ আসনের এমপি ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। বাঁশের সাঁকো দেখলে তিনি খাল বা নদী পাড়ি দিতেন না। এমপি হওয়ার পর সাঁকোকে বিদায় জানাতে কাজ করেছিলেন সাইফুর রহমান।
আরিফ তখন ছিলেন সাইফুরের ছায়া সঙ্গী। অনেক উন্নয়ন করেছিলেন সিলেট-৪ আসনে। এবার যখন মাঠে নামলেন ১৭ বছরের উন্নয়ন দেখে নিজেই হতাশ হন। এমনটি তো হওয়ার ছিল না। কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের দিকে কেউ-ই ফিরে তাকাননি। কোনো কোনো গ্রাম থেকে ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার। যাতায়াতের সড়ক নেই। থাকলেও যান চলাচলের উপযোগী নয়। আরিফ এ নিয়ে প্রতিবাদী হলেন। ইসি ও প্রশাসনকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন দুর্দশার চিত্র। করলেন প্রতিবাদ। ভোটারকে কেন্দ্রে নিয়ে আসার সহজ পথ করার দাবি জানালেন। তার কথায় কাজ হয়েছে অনেক জায়গায়। অন্তত ২০টি গ্রামীণ সড়কের কাজ চলছে। ভোটের আগে ভোটারের সুবিধার্থে এসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হচ্ছে। এতে সুবিধা পাবেন সব প্রার্থীর ভোটাররা। আরিফ আগ বাড়িয়ে নিজের ঢোল নিজে পেটাচ্ছেন। না পেটালেও চলে।
সিলেট-৪ আসন এখন আরিফময় হয়ে উঠছে। যেখানেই যাচ্ছেন তাকে ঘিরে ধরছে মানুষ। আসার খবর শুনলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকেই। এমন দৃশ্য অনেক আসনেই অনুপস্থিত। সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সুরেই এখন কথা বলছেন আরিফ। বলছেন সিলেট-৪ আসনের মানুষ বড়ই দুঃখী। এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি তারা। শেষ সময়ে এসে তার চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। সিলেটের সবচেয়ে অবহেলিত আসনকে তিনি দেখাতে চান উন্নয়নের পথ। এখন হাঁটছেন। সব দেখছেন। নোটও করছেন। কী করতে হবে গ্রামের মুরুব্বিদের মুখ থেকে জেনে নিচ্ছেন। ঘোষণা দিয়েছেন ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার দায়িত্ব আপনাদের। আর ১২ই ফেব্রুয়ারির পর আপনাদের দায়িত্ব শেষ, আমার দায়িত্ব শুরু। আপনারা শুধু বলবেন আর দেখবেন। বাকি দায়িত্ব আমার। আরিফের এমন ম্যাজিকের কাছে ভোটের মাঠকে তাতিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন জামায়াত প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। ভোটের মাঠে নানাভাবে আক্রমণ করার চেষ্টা করছেন তিনি। কথার ছলে জর্জরিত করছেন। এতে কান নেই আরিফের। নিজে হাঁটছেন নিজের মতো করে। যেমনি করে হেঁটেছিলেন নগরের অলিগলিতে এখন হাঁটছেন গ্রামের মেঠোপথ ধরে।