নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বাড়ছে উত্তাপ। দলগুলোর প্রচার প্রচারণা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সরগরম নির্বাচনের মাঠ। প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলছে। এসব অভিযোগের জবাবও দিচ্ছে প্রতিপক্ষ। কোনো কোনো অভিযোগ নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত যাচ্ছে। নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর পর থেকে অভিযোগ উঠে একটি দলের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করছেন। ভোটারদের মোবাইল নম্বর বা বিকাশ নম্বর সংগ্রহেরও অভিযোগ আসে। নির্বাচন কমিশনে এই অভিযোগ করে বিএনপি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াতের নির্বাচনী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের এনআইডি’র কপি, বিকাশ নম্বর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছেন, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ এবং একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপি’র এই অনুরোধের পর নির্বাচন কমিশনও এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভোটারদের এনআইডি সংগ্রহ ও উপহার দেয়ার বিষয়ে সর্ব সাধারণকে সতর্ক করেছে। সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিলেও ভোটারদের এনআইডি সংগ্রহে জড়িত কারও বিরুদ্ধে ইসি’র ব্যবস্থা নেয়ার কোনো তথ্য মিলেনি।
মানবজমিন গত কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পেরেছে সমালোচনার কারণে এখন সতর্ক হলেও আগে অনেক ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করা হয়েছে। ভোটারদের মোবাইল নম্বরও নেয়া হয় এই কপির সঙ্গে। বিকাশ নম্বর চাওয়া হয়েছে এমন তথ্যও মিলেছে দু’এক জায়গায়। কেন এনআইডি’র কপি নেয়া হয়েছে তার কারণ খুঁজতে গিয়েও মিলেছে চমকপ্রদ তথ্য। নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো, ভোটের আগে নিজ দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোটারদের উৎসাহী করতে বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেয়া, সুবিধা বঞ্চিত বা দরিদ্র ভোটারদের আর্থিক প্রতিশ্রুতি বা আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই কাজ করা হয়। এ ছাড়া ভোটারদের এনআইডি’র ডুপ্লিকেট কপি তৈরি করে এজেন্ট নিয়োগ, ভোটে কাজে লাগানোর মতো অনৈতিক উদ্দেশ্যেও কোথাও কোথাও এমনটি করা হয়েছে। ভোটে নারীদের বেশি উপস্থিতি নিশ্চিত করার চিন্তা থেকেও এনআইডি, মোবাইল নম্বর সংগ্রহের তথ্য মিলেছে। ভোটে ব্যাপক সংখ্যক নারীর উপস্থিতি দেখাতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট বেশি কাজ করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশলও নেয়া হয়েছে। নারীদের বেশি সমর্থন দেখাতে পারলে ভোটের ফলে তা বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন।
জামায়াত জোটের বাইরের একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দাবি করেন, একটি দলের পক্ষ থেকে নারী ভোটারদের বোরকা উপহার দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, লাখ লাখ নারী ভোটারকে এমন উপহার দেয়ার তাদের টার্গেট রয়েছে বলে জানতে পেরেছেন।
এই প্রার্থীর দাবি বোরকা নিয়ে তার কোনো ধরনের আপত্তি নেই। কিন্তু বোরকা পরে বেশি সংখ্যক নারী কেন্দ্রে গেলে তারা কতো সময় অবস্থান করছেন, কী করছেন তা চিহ্নিত করার বিষয়টি কঠিন হতে পারে।
ভোটারদের এনআইডি সংগ্রহের বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ নির্বাচন করার কথা বলছে। তারা স্বচ্ছ নির্বাচন চাইলে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি কোনো উদ্দেশ্যে ভোটারদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে বা তাদের ফোন নম্বর নেয় তাহলে প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে। নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা তথ্য আসলে এই অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে। তখন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে। মাঠে পাল্টাপাল্টি না বলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা কমিশনে জমা দেয়ার পরামর্শ দেন এই আইনজীবী।
জামায়াতের পক্ষ থেকে ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এটি জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা। গতকাল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নারীরা বাসায় গিয়ে এনআইডি বা বিকাশ নম্বর চাইছেনÑএমন দাবি সম্পূর্ণ অসত্য। মূলত জামায়াতের প্রতি নারীদের ব্যাপক সমর্থন দেখেই একটি বড় দল ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য এমন করছে। এর আগে শনিবার ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংবাদ সম্মেলনে দলটির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি এটিএম মা’ছুম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা ভোটারদের এনআইডি বা টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ করছি না। এগুলো ভুয়া খবর ছড়িয়ে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি এবং নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এমনটা কামনা করি না।
জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নাকচ করা হলেও নির্বাচন কমিশন ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের বিষয়টি নজরে এনেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সাংবিধানিক এ সংস্থাটি বলছে, এসব কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বৃহস্পতিবার ইসি’র জনসংযোগ শাখার পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০ অনুযায়ী, অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র বহন কিংবা হস্তান্তর করা যাবে না। এতে আরও বলা হয়, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি-৪ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার চাঁদা, অনুদান বা উপহার প্রদান করতে বা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না। এসব কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নির্বাচন কমিশন সব নাগরিক ও সংগঠনকে উল্লিখিত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।