Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক বাকি। ভোটের নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবার ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় কাজ করবে। কিন্তু এত নিরাপত্তা প্রস্তুতির পরও নানা ধরনের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রার্থীরা সবচেয়ে বড় শঙ্কা দেখছেন ভোটের দিন।

ভোটকেন্দ্র দখল থেকে শুরু করে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা, গোলাগুলি, ভোটের ফলাফল নিয়ন্ত্রণে নেয়াসহ নানা ধরনের শঙ্কা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছেÑ অতীতের চেয়ে এবারের নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হবে। কারণ পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র যেমন এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি তেমনি দেশের সীমান্ত দিয়ে নির্বাচনকে ঘিরে আসা অবৈধ অস্ত্রেরও হদিস পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের আগে পরে দেশের কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি, চরমপন্থি, দাগি আসামিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। এর বাইরে অভ্যুত্থানের পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে প্রকাশ্যে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখা হয়নি। তারা অনেকটা বেপরোয়াভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে তারা বিভিন্ন প্রার্থীদের হয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। 

অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে লাখ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাটানোর মতো কোনো কিছু দৃশ্যমান করা হয়নি। একদিকে মনোবলহারা পুলিশ সদস্যরা এখন চাঙ্গা হতে পারেনি। এ ছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক খুনখারাবির ঘটনা ঘটেছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা কাটছে না ভোটারদের মধ্যে। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ব্যাপক ও বহুমাত্রিক হলেও এই প্রস্তুতি জনগণের আস্থা অর্জনে কতোটা সফল হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণ এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেবে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য মাঠে থাকবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন, পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি বিজিবি, র‍্যাব, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্যই প্রায় ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫৫২টি কেন্দ্রে আগে থেকেই ক্যামেরা রয়েছে। অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ২১ হাজার ৯৪৬টি কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে নতুন করে সিসিটিভি স্থাপনের জন্য সরকার ৭১ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে কমপক্ষে ছয়টি ক্যামেরা থাকবে, যার মাধ্যমে ভোটগ্রহণ, ব্যালট বাক্স সংরক্ষণ ও কেন্দ্রের ভেতরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই ফুটেজ জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মনিটরিং করা হবে। এটি দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা উদ্যোগ।                                                                                                                                                                     নির্বাচনী নিরাপত্তায় এবার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। অন্তত ৩০ হাজার কেন্দ্রে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে ভোটকেন্দ্রে কী ঘটছে, পুলিশ কীভাবে দায়িত্ব পালন করছে সবকিছুই রেকর্ডে থাকবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৬ হাজার কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ (ঝুঁকিপূর্ণ) এবং প্রায় ৮ হাজার কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন পরে এগুলোকে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ। অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হবে, থাকবে অতিরিক্ত মোবাইল টিম, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল। এসব কেন্দ্রে নজরদারি থাকবে তুলনামূলকভাবে বেশি।

ঢাকা মহানগরীতে ২ হাজার ১৩১টি ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকবে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য। প্রতিটি কেন্দ্রে অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য থাকবে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উপস্থিতির কারণে রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।

ভোটের মাঠে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য শনাক্তে এবার ভোটের মাঠে বড় পরিসরে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে। বিজিবি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমান্ত এলাকায় ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করবে। এ ছাড়া র‌্যাব ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এবং ডিএমপি ও সিএমপি পৃথকভাবে ডগ স্কোয়াড নিয়োজিত রাখবে। দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পৌঁছাতে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার যে চ্যালেঞ্জ আছে সেগুলো এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। ভয়ভীতিহীন একটা পরিবেশ এখনো তৈরি করা যায়নি। মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতো সদস্য কাজ করছে সেটি দেখে না বরং কীভাবে দায়িত্ব পালন করেছে সেটি দেখে। ইতিমধ্যে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান বিবৃতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না মানুষ। আর তারাই তখন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে। এখন পারছে না তখন তারা জোরালো দায়িত্ব পালন করতে পারবে সেই ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ ছাড়া পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রগুলো সাধারণ মানুষের কাছে না। সেগুলো অপরাধী, অপরাধ চক্র এবং এমন সব মানুষের কাছে যারা বিভিন্ন প্রয়োজনে এসব অস্ত্র ব্যবহার করবে। তাদের সঙ্গে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পারছে না আর নির্বাচনের সময় পারবে সেটি মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ ওই সময় তারা আরও বেশি সক্ষম বা সুপার ক্যাপাবল হয়ে যাবে? এসব কারণেই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে ভাবাচ্ছে। তাই ভোটকেন্দ্রে যদি কোনো সংঘাতের সৃষ্টি হয় তবে ভোটাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবে না। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন ঘটনায় শক্ত পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এতে করে মানুষের শঙ্কা কাটবে।           

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদ হোসেন  মানবজমিনকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পরে পুলিশের ভেঙে যাওয়া মনোবল এখনো তারা ফিরে পায়নি। কিছু ঘটলেই সেটি সেনাবাহিনী, বিজিবি বা র‌্যাব সামলাবে এ ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে। পুলিশ জানে প্রতিটি থানায় কে অপরাধী, কার কাছে অস্ত্র আছে। এগুলো সেনাবাহিনী বা বিজিবি’র কাজ না। তিনি বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে যতই ঢাকঢোল পেটানো হোক না কেন এটি সার্বজনীন নির্বাচন না। আগেও যেমন হয়েছে এখন হচ্ছে। এবারো যেসব দলকে বাদ দেয়া হয়েছে তাদের সমর্থকদের ক্ষোভ কাজ করবে। তিনি বলেন, যতগুলো অস্ত্র লুট হয়েছে থানা থেকে সেগুলো মধ্যে এখনো ২০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। লুট করে এক অপরাধ করেছে, আবার সেগুলো নিজের কাছে রেখে দিয়ে আরেক অপরাধ করেছে। তাই সেগুলো কোনো ভালো উদ্দেশ্যে নিজের কাছে রাখেনি। এ ছাড়া সম্প্রতি কিছু নেতা ও প্রার্থীদের সরকার অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। এসব অস্ত্রের প্রভাব বিস্তার হতে পারে প্রতিপক্ষের ওপর।