Image description

এবারের নির্বাচনটি অনেক দিক দিয়ে আলাদা। একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরের নির্বাচন হওয়ায় প্রার্থী নির্বাচনে সতর্ক থেকেছে দলগুলো। জুলাই আন্দোলনে অপেক্ষাকৃত বেশি তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে প্রার্থী নির্বাচনেও।

জুলাইয়ের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন যারা, তাদের অনেকেই নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন প্রথমবারের মতো। ফলে বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একেবারে আনকোরা প্রার্থী যেমন আছেন, তেমনই আছেন দীর্ঘদিন মাঠে সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে সরব থাকা ব্যক্তিরা। যারা নিজেদের কাজের ও যোগাযোগের কারণে আলোচিত প্রার্থী হিসেবে স্বাক্ষর রাখছেন। নির্বাচনি পরিবেশ বিশ্লেষণ বলছে—এই আলোচিত প্রার্থীরা নির্বাচনে জিতুক বা না জিতুক— ফলাফল, ভাষা আর রাজনীতির দিক বদলাতে সহায়ক হতে পারে।

যেখানে বড় দুই-তিনটি দলের উপস্থিতি আছে, সেখানে যদি একজন বিশ্বাসযোগ্য, পরিচিত বা আলোচিত বিকল্প প্রার্থী থাকেন, তাহলে তিনি না জিতলেও তরুণ, সচেতন, ক্ষুব্ধ ভোটারদের টানতে পারবেন। কেননা, এ ধরনের প্রার্থীরা এলাকার জরুরি বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, স্থানীয় হাসপাতাল, শিক্ষা, নারী বা শ্রমিক ইস্যু নিয়ে সাধারণত কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরতে পারেন।

নির্বাচনি প্রচারণায় নেমেছেন মিজানুর রহমাননির্বাচনি প্রচারণায় নেমেছেন মিজানুর রহমান

২০১৯ সালে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং তার পরিবার ঢাকা ওয়াসা ভবনে গিয়ে সংস্থার এমডিকে পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন— এটা ছিল একটি প্রতিবাদধর্মী কর্মসূচি, যাতে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে ওয়াসার পানি পানের উপযোগী নয়। মিজান দীর্ঘদিন ধরে তার আসনের রাস্তাঘাটের দুর্দশা ও বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন। তিনি এবার ঢাকা-৪ আসনে নির্বাচন করছেন। এই আসনে বিএনপি থেকে তানভীর আহমেদ রবিন, আর জামায়াতে ইসলামী থেকে সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মনোনয়ন পেয়েছেন। বড় দুটি দলের প্রচারণার পাশাপাশি মিজানুর রহমানের উপস্থিতিও এই এলাকায় লক্ষণীয়। তিনি অনেক বড় পরিবর্তন করতে পারবেন— এমন কোনও পূর্বাভাস নেই, কিন্তু তার এক ধরেনর জনবান্ধব চেহারা দাঁড়িয়েছে, সে কারণে ভোটারদের মাঝে তিনি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছেন।

কেন নির্বাচনে দাঁড়ালেন প্রশ্নে মিজান বলেন, ‘‘আমি অনেকটা বাধ্য হয়েছি দাঁড়াতে। দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার কাজ পড়ে থাকে, কাজ হয় না, নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে করি। এবার মনে হয়েছে, এভাবে আর না। ২০১৫ সালে আমাকে এলাকাবাসী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিল। এবার আমি তাদের বলেছি, আমি নির্বাচন করবো, তোমরা সঙ্গে থাকবা কিনা।’’ তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের পরিবেশ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার যা পরিস্থিতি— নেতা যদি ভালো না হন, নেতার যদি কথায় ও কাজে মিল না থাকে, তাহলে এই দেশকে কেউ ঠিক করতে পারবে না।’’

গার্মেন্টস সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার ঢাকা-১২ আসনের পরিচিত মুখ। গার্মেন্টস আন্দোলনের কারণে তাকে এক যুগের বেশি সময় তাকে সরব দেখা গেছে শ্রমিকদের মধ্যে। তিনি শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) তার দলের পক্ষ থেকে ১২ দফা ইশতেহার দিয়েছেন। এলাকায় নিয়মিত প্রচারের কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাকে শ্রমিক আন্দোলনের নেতা হিসেবে লোকজন চেনে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন করবেন এমনটি হয়তো ভাবেননি জনগণ।

নতুন মুখের তালিকায় সুশীল সমাজের মধ্যে অনেক বেশি আগ্রহ তৈরি করছেন সদ্য এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী তাসনিম জারা। তিনি ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচন করছেন। তিনি এলাকায় গিয়ে ভোট চাইছেন সাবলীলভাবে। সেসবের রিলস মাসখানেক ধরেই ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। তার কিছু সুশীল ফলোয়ার আছেন, যারা তার চলাফেরা, কথা বলা নিয়ে ফেসবুকে ইতিবাচক লিখছেন। যদিও তার নির্বাচনি প্রচারণায় খুব বেশি ভিড় দেখা যায়নি।

তাসনিম জারা ছোট একটি দল নিয়ে এলাকায় ঘুরছেন, পথে বাজারে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তার বিপরীতে ঢাকা-৯ আসনে বড় দুই জোটের মনোনীত প্রার্থীরা হলেন হাবিবুর রশিদ হাবিব (বিএনপি) ও কবির আহমেদ (জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত)।  হাবিবুর রশিদ স্থানীয় নেতা ও দলীয় সিনিয়র কর্মী হিসেবে পরিচিত এবং এলাকায় দীর্ঘদিন রাজনীতি করছেন।

গাজীপুর-৪ আসনে প্রচারণায় অংশ নেন সিপিবির প্রার্থী মানবেন্দ্র দেবগাজীপুর-৪ আসনে প্রচারণায় অংশ নেন সিপিবির প্রার্থী মানবেন্দ্র দেব এবারের নির্বাচনে বাম দলগুলোতেও তরুণ প্রার্থীর সংখ্যা অনেক। গাজীপুর- ৪ (কাপাসিয়া) আসন থেকে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মানবেন্দ্র দেব। এরই মধ্যে তিনি প্রচারণা শুরু করেছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছেন বেশ কয়েকজন সহ-প্রার্থীর সঙ্গে। মানবেন্দ্র ছাত্ররাজনীতি করে দীর্ঘ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সরাসরি যুক্ত থেকে এখন ভোটের মাঠে নেমেছেন। গাজীপুর জেলায় মোট ৫টি সংসদীয় আসন এবং এই আসনগুলোতে ৪২ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন। তার এলাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী।

বিএনপির শাহ রিয়াজুল হান্নান। তার বাবা ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত আ স ম হান্নান শাহ। এ আসনে অপর প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইউবী।

প্রচারণার প্রথম দিনই বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বরিশাল নগরী প্রচার-প্রচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাসদসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা সকাল থেকে সারা দিন নগরীতে সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। বরিশাল-৫ (সদর) আসনে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী হিসেবে আছেন।

বরিশাল-৫ আসনে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীবরিশাল-৫ আসনে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী এ আসনে তার বিপরীতে রয়েছেন বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

নির্বাচনে তারুণ্যের উপস্থিতি কেমন দেখছেন এবং কী ধরনের পরিবর্তন সাধিত হবে বলে মনে করছেন— প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে প্রবীণদের উপস্থিতি, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছিলেন। তার বিপরীতে তরুণদের জায়গা করে নেওয়া বেশ কঠিন ছিল। জুলাই-আগস্টের পরবর্তী সময়ে সে চিত্র বদলে যাওয়ার কথা থাকলেও আমরা ঠিক আশানুরূপ পরিবর্তন দেখছি না। কিন্তু একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। ‘আই হেইট পলিটিক্স’ বলে যে একটা ন্যারেটিভ তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল— সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সংসদ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। দেশের তরুণেরা চাকরির জন্য, জীবনযাপনের জন্য যত কষ্ট করে, তারা রাজনীতিতে সেই পরিশ্রম করতে চায় না। কিন্তু দেশকে পরিবর্তন করতে চাইলে সেটা রাজনীতির মধ্য দিয়েই করা সম্ভব। যদিও প্রত্যাশার তুলনায় তরুণ প্রার্থী কম। আমার প্রত্যাশা থাকবে, তরুণেরা আরও আরও বেশি রাজনীতিতে আসুক, রাজনীতি শিখুক। কারণ, পরিবর্তন রাজনীতির মধ্য দিয়েই সম্ভব।’’