Image description
প্রস্তাবিত পে-স্কেল

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে পে-কমিশন। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সমাজে আয়-বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি উস্কে দেবে। এতে করে সাধারণ মানুষ নতুন করে চাপে পড়বে।

প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে নতুন সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এটি বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের জোগান দেয়াই হবে চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য সরকারের আয় বাড়াতে হবে। ফলে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে একধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।

জানা গেছে, গত বুধবার পে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সব সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশের প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। কমিশন-প্রধান জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। 

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতাকাঠামো বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তার চাপ পরবর্তী সরকারকে নিতে হবে এবং অর্থের সংস্থানের উপায় তাদেরই বের করতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিতে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়তি করের বোঝা নেয়ার সুযোগ নেই। তাই আয় না বাড়িয়ে একসঙ্গে সব স্তরে বেতন বাড়ানো অযৌক্তিক। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিনিয়োগ কম, মূল্যস্ফীতিও বেশি, সরকারের রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতা রয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। এ অবস্থায় বেতন বাড়ানোর ফলে এর ফলাফল কী হবে?

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। গত কয়েক বছর ধরে সরকারকে ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তার উপর পুরো উন্নয়ন ব্যয় ধারে করতে হয়। কর আহরণ বাড়ানো যায়নি।  কিন্তু ঋণ করে বেতন বাড়ালে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, বেতন বৃদ্ধির এ সুপারিশ অত্যন্ত বেশি। এই সুপারিশ আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। এই পরিমাণ ব্যয়ের ভার বহন করার সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির নেই। এর ফলে পরবর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি হবে। বেসরকারি খাতেও চাপ বাড়বে। এ কারণে সুপারিশ বাস্তবায়ন আরও বিলম্ব করা উচিত। 

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ কার্যকর হলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। তবুও সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে এর প্রভাব পড়বে, যা সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এদিকে, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো নিয়ে বেসরকারি চাকরিজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষ বেশ চিন্তিত। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়বে না। কিন্তু বাজারে এর প্রভাব ঠিকই পড়বে। তখন কীভাবে সংসার চালাবো সেই চিন্তাই বেশি মনে পড়ছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে কথা হয় রিকশাচালক মো. করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে আমাদেরও ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হতে হবে। 
একজন নারী উদ্যোক্তা কাকলি বেগম বলেন, সরকার কর্মচারীদের বেতন বাড়বে। একই সঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবী এবং খেটে খাওয়া মানুষের বিষয়টিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। বেতন বাড়লে দাম বাড়ে- এটা অতীতে দেখা গেছে।