Image description
পঞ্চগড়ে শফিকুর রহমান

দেশের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনপদ উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিগত দিনে এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত ও পিছিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাচিত হতে পারলে ইনসাফের ভিত্তিতে এই অঞ্চলকে এগিয়ে নেয়া হবে। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের কার্ড।

জামায়তের আমীর গতকাল শুক্রবার নির্বাচনের প্রচার উপলক্ষে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরের বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। 

উত্তরাঞ্চল সফরের প্রথম দিনে প্রথমে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে ১০ দলীয় জোটের জনসভায় বক্তৃতা করেন জামায়াত আমীর। সমাবেশে পঞ্চগড়-১ আসনে জোটের প্রার্থী সারজিস আলম এবং পঞ্চগড়-২ আসনের প্রার্থী শফিউল্লাহ সুফিকে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।

পঞ্চগড় চিনিকল চালুর ঘোষণা দিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, এই অঞ্চলের উর্বর মাটি কৃষির জন্য প্রসিদ্ধ। কিন্তু উৎপাদিত কৃষির সঠিক মূল্য কৃষকরা পায় না। ক্ষমতায় আসতে পারলে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার করে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, ওরা জনগণের প্রতি পাঁচ বছরে একবার দরদের হাণ্ডিতে জ্বাল দিয়ে বুদবুদ উঠিয়ে দেয়, বাকি সময় আর চার বছর হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না।  কেউ কেউ আবার বসন্তের কোকিল, বসন্তকাল আসলে বলে কুহ কুহ। উড়ে আসে জুড়ে বসে মানুষের সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নাই। আমরা এই রাজনীতিকে ঘৃণা করি। আমরা ছিলাম আছি থাকবো।  দেশবাসীকে ফেলে কোথাও আমরা যাইনি, আগামীতেও দেশবাসীকে ফেলে কোথাও আমরা যাবো না। জীবনে-মরণে একসঙ্গে লড়াই করবো। প্রিয় বাংলাদেশকে আমরা গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা এবার ভোট দেবার জন্য চঞ্চল হয়ে আছেন, আপনার ভোট যদি কেউ ডাকাতি করতে আসে, তাহলে রুখে দিতে হবে। যুবকরা, কাজ শেষ হয়নি কেবল শুরু হয়েছে। এদেশ থেকে বৈষম্য অবিচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, আধিপত্যবাদমুক্ত ন্যায় ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা থামবো না। আমাদেরকে কেউ থামাতে পারবে না।

জামায়াত আমীর বলেন, আমাদের হাতে কোনো কার্ড নাই। আপনাদের বুকে ভালোবাসার কার্ড চাই। সমর্থন দোয়া ও ভালোবাসা আমাদের কার্ড। উত্তরবঙ্গ সারা দেশে খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে, আজ সেই উত্তরবঙ্গকে পিছিয়ে  রাখা হয়েছে ইচ্ছা করে। আমি তার সাক্ষী হতে এসেছি। উত্তরবঙ্গ থেকে আমরা কোনো বেকারের মুখ দেখতে চাই না। আমরা সকলের হাতে মর্যাদার কাজ দিতে চাই।

আমাদের প্রত্যক যুবক-যুবতী, প্রত্যেকটা নাগরিককে দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তৈরি করতে চাই। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক রাজধানী হিসেবে দেখতে চাই। বন্ধ চিনিকল খোলা দেখতে চাই।

বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমীর পঞ্চগড়-১ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলমকে শাপলা কলি প্রতীক ও পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সফিউল আলম (সফিউল্লাহ সুফি)কে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হাতে তুলে দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।

জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পঞ্চগড় জেলা আমীর মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলম, ১০ দলীয় জোট সমর্থিত ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী সফিউল আলম (সফিউল্লাহ সুফি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

পঞ্চগড় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনের সঞ্চালনায় এ সময় আরও বক্তব্য দেন, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত স্থানীয় নেতারা। জনসভা শুরুর আগে সকাল থেকে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দেন। 

ওদিকে, ঠাকুরগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দশ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী প্রচারণা সমাবেশে জামায়াত আমীর বলেন, সারা দেশের চৌষট্টি জেলায় উন্নতমানের একটি করে হাসপাতাল তৈরি করা হবে। বঞ্চিত এলাকায় আগে দেয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচিত হলে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা হবে। প্রথমত, দুর্নীতি করবো না এবং করতেও দেয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। বিচারে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না। যারাই অন্যায় করবে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তৃতীয়ত, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, সন্ত্রাস করতে দেয়া হবে না।

জামায়াত আমীর বলেন, একদল বেকার ভাতা দিতে চায়। আমরা বেকার ভাতা নয় যুবকদের কাজ দিয়ে সম্মানিত করতে চাই। এদেশের যুবকরা কাজ করে খেতে চায়। আমরা আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হলে যুবকদের কাজ সৃষ্টি করার জন্য টেকনিক্যাল কাজ  শেখাতে চাই।

এ সময় ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের মাওলানা আব্দুল হাকিম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের মিজানুর রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াতের আমীর। 

ওদিকে দিনাজপুরের জনসভায় জামায়াতের আমীর বলেন,  চাঁদাবাজির কারণে মানুষ এখন দিশাহারা হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজ আর দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে আমরা চাঁদাবাজি বন্ধ করবো। আর এ কথা তারাই বলতে পারে যারা চাঁদাবাজি করে না।

জামায়াতের আমীর বলেন, আমরা সকল প্রকার দুর্নীতি বন্ধ করবো।  সোনার বাংলাদেশে আর কাউকে দুর্নীতি করতে দেয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার কথায় দুর্নীতি আর চাঁদাবাজরা ভয় পেয়ে গেছে তারা বলছে জামায়াতের আমীর এসব কী বলছে। তাহলে আমরা  কোথায় যাবো। আশ্বাসের সুরে তিনি বলেন, তোমরা আমাদেরই সন্তান, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বাদ দাও, আমরা তোমাদের কোলে তুলে নেবো। কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।

শুক্রবার বিকালে দিনাজপুর গোর-এ শহীদ ময়দানের দক্ষিণাংশের মাঠে জনসভার আয়োজন করা হয়। 
জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আফতাব উদ্দিন মোল্লা, শিবিরের সাবেক সভাপতি রাজিবুর রহমান পলাশ,  দিনাজপুর-৬ আসনের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, দিনাজপুর-৫ আসনের প্রার্থী ও এনসিপি নেতা ডা. আব্দুল আহাদ, দিনাজপুর-২ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ এম আফজালুল আনাম, দিনাজপুর-৩ আসনের প্রার্থী এডভোকেট মাইনুল আলম, দিনাজপুর-১ আসনের প্রার্থী মো. মতিউর রহমান, দিনাজপুর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা মুজিবুর রহমান,  জুলাইযোদ্ধা একরামুল হক আবির প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দিনাজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাদ্দিস এনামুল হক। 

সভায় জামায়াত আমীর বলেন, ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বৈষম্যের অবসান শুরু হয়েছে। আমরা সরকার গঠন করতে পারলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি- পেশার বৈষম্য দূর করা হবে। বৈষম্য দূর করা হবে ধর্ম-বর্ণের। সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই। একটি বাগানের যেমন সব ধরনের গাছ নিয়ে বেড়ে উঠে, তেমনি এই দেশেই সকল মানুষকে নিয়ে উন্নত ভবিষ্যত তৈরি করতে চাই, আধুনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই।

তিনি বলেন, দিনাজপুরে গণ-অভ্যুত্থানে ১১ জনসহ সারা দেশে সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে। আহত হয়েছে অগণিত। ’২৪-এর জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আপনারা যে যুদ্ধ করেছেন এরকম আরেকটি যুদ্ধ বাকি রয়েছে। যুদ্ধটি হচ্ছে ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লাসহ জোটের প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে ভোটারদের প্রতি  আহ্বান জানান। জামায়াত আমীর  বলেন, জুলাই না হলে আজ আমরা দাঁড়াতে পারতাম না। প্রকাশ্যে কথা বলতে পারতাম না। নির্বাচন হতো না।  চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশে আর ফ্যাসিস্ট জন্ম না নেয় এর জন্য সৎ মানুষদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে হবে। গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য জামায়াত আমীর ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। 

নির্বাচিত হলে উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: ওদিকে রংপুরে আয়োজিত জনসভায় জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নদী জীবন ফিরে পেলে উত্তরবঙ্গ জীবন ফিরে পাবে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে কার ভালো লাগে এবং কার লাগবে না, এতে আমাদের কিছু যায় আসে না। আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিলে, উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তাতেই কোদাল বসাবো। রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন,  কোনো অসৎ মজার মজার মিথ্যা ওয়াদা দিলে তাদের লাল কার্ড দেখাবেন। এই দেশে আমরা চারটি ধর্মের মানুষ বসবাস করি। আল্লাহ আমাদের নিজ ইচ্ছায় এই দেশে পাঠিয়েছে। আল্লাহ সকল ধর্মের মানুষের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেছে। মুসলমান অন্য কোনো ধর্মের ওপর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আমরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইরান বানাতে চাই না। আমরা বাংলাদেশকে প্রিয় গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে তৈরি করতে চাই।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম, এনসিপি’র সদস্য সচিব আকতার হোসেন, শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা প্রমুখ।