ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী, বিদ্রোহী এবং বঞ্চিতদের কারণে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভেদ বাড়ছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে তৃণমূলে ততই কলহ তীব্র হচ্ছে। কোথাও কোথাও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। এই অস্থিরতা দ্রুত থামানো না গেলে নির্বাচনী ফলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে দলের সিনিয়র নেতারা মনে করছেন। ওদিকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল এবং জোটের সঙ্গেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি বিএনপি।
যদিও কয়েকটি শরিক দল এবং জোটকে বিভিন্ন আসনে সমর্থন দিয়েছে। আবার কয়েকজন নেতা দল ছেড়ে এবং নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের আসনেও বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এসব আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বের করে নিয়ে আসা অনেক কঠিন হবে বলে মনে করছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কয়েকজন নেতা। এ ছাড়া বিএনপি’র দুই-একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সহায়তা করারও অভিযোগ উঠেছে।
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি। গত বুধবার ৫৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে আরও ১২ জন্য প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। সবমিলিয়ে ৭১ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আবার বেশ কয়েকজন প্রার্থী দলের সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। যারা সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনের মাঠে শেষ পর্যন্ত থাকবেন দল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। তাদের কর্মী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে কোন্দল নিয়ে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং মনোনয়নবঞ্চিত ১৭ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেনÑ নব্য, হাইব্রিড, অতীতে দলীয় সুবিধাভোগী, আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় এবং প্রবাসে থাকা অনেককে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। যার কারেণ ত্যাগী, যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতাদের বঞ্চিত হয়েছে। এ কারণে সারা দেশে তৃণমূলে ক্ষোভ বাড়ছে। এর বাইরে মাঠে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীও রয়েছেন। তাদের কর্মী ও সমর্থকরা বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নয়। কারণ বিএনপি’র এসব আসনে দলের যোগ্য, ত্যাগী এবং জনপ্রিয় নেতাকে মনোনয়ন দেয়নি। ফলে দলের অভ্যন্তরে মতানৈক্য ও দ্বিধাবিভক্তি বেড়েই চলছে। এক্ষেত্রে নির্বাচনী ফলাফলে লাভজনক হবে জামায়াতের।
ওদিকে বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীতে নির্বাচনী প্রচারণার মিছিলকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র দু’গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ১০ জন আহত হয়েছে। দীঘিরপাড় বাজার থেকে ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি শামীম মোল্লার সমর্থকরা মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে দলের প্রার্থী এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার মিছিল নিয়ে কামারখাড়া এলাকায় গেলে একই দলের সমর্থক ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
বিএনপি’র এক সিনিয়র নেতা মানবজমিনকে বলেন, দলের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বঞ্চিতদের মধ্যে যে কোন্দল দেখা যাচ্ছে, এটা দলের জন্য অশনিসংকেত। আর এখন শুধু ধানের শীষ দেখে কেউ ভোট দেবে না। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ৫ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মধ্যদিয়ে সেই প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন হয়েছে। মনোনয়ন ঘিরে তৃণমূলের যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তা এখনই নিরসন না করলে দলের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একটি আসন ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপি’র। সেটা ঢাকায় নাকি বগুড়ায়, তা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তিনি ঢাকা-১৮ এবং বগুড়া-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনকে ও বগুড়া-২ আসনে বিএনপি’র নেতা মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দিয়েছে। তবে বগুড়া-২ আসনে মান্নাকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। এরপরেও সেখানে বিএনপি প্রার্থী দেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয় নিয়ে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলন করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। সেখানে তিনি জানান, বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮ আসন থেকে নির্বাচন করবেন তিনি।
বিএনপি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আসন ছাড় দেয়ার পরেও কেন সেখানে দলীয় প্রার্থী দিলো বিএনপিÑ এ বিষয়টি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, তাহলে কি বিএনপি’র কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই। তারা তো তাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের কথা দিয়েছিল, সেটা তারা রক্ষা করেনি। এখন নির্বাচনী প্রচারণায় যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা কি রক্ষা করবে? আবার দলের বিদ্রোহী দৃশ্যমান মাঠে নামলেও অনেকে আবার অদৃশ্য থেকে বিএনপি’র বিরুদ্ধে কাজ করছেন। এই অদৃশ্য ব্যক্তিরাই বিএনপি’র জন্য ভয়ঙ্কর বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
বিএনপি’র আরেক সিনিয়র নেতা মানবজমিনকে বলেন, যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকরা বিভিন্ন উদ্দেশ্য হাসিলে কাজ করছেন। এটা নির্বাচনের আগে দলের বড় ক্ষতি হবে। যুগপৎ আন্দোলনে যেসব নেতাকে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে, সেখানে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। এসব নির্বাচনে প্রভাব অবশ্যই পড়বে।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না। অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আবার অনেককে বহিষ্কার করা হয়েছে। সামনে আরও সাংগঠিনক ব্যবস্থা নেয়া হবে।