আসন সমঝোতার পরও কাটেনি বিএনপি মিত্রদের অসন্তোষ। দলীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির বিদ্রোহীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মিত্রদলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে। তবে এমন অবস্থার মধ্যেও নির্বাচনি মাঠে শেষ পর্যন্ত লড়বেন তারা। কেউ কেউ এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করেছেন। এদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বগুড়া-২ আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিএনপি। ওই আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারও করেনি দলটি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মান্না। যদিও অন্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিষয়ে হার্ডলাইনে রয়েছে বিএনপি। ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের যোগাযোগ না রাখার কথাও বলা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান যুগান্তরকে বলেন, মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আসন ছাড় দিয়েছেন। ওইসব আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। যারা দলের নির্দেশনা অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।
তারপরও মিত্রদের কারও মধ্যে আসন নিয়ে কিছুটা হতাশা কাজ করছে। তবে একটা সময় এসব থাকবে না। ছাড় দেওয়া আসনগুলোতে আমাদের নেতাকর্মীরা মিত্র প্রার্থীদের জন্য কাজ করছেন।
মিত্রদলের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিএনপির তৃণমূলকে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে হাইকমান্ড থেকে। কিন্তু এরপরও কিছু আসনে ‘বিদ্রোহী’রা তোয়াক্কা করছে না। ফলে মাঠপর্যায়ে এখনো দ্বিধা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি জানানোর পর কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম বলে মনে করছে মিত্রদলগুলো। দলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থী মনে করেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি আরও কঠোর নির্দেশনা না দিলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।
জানা যায়, যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্রদের সঙ্গে ১৬ আসনে সমঝোতা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ৭ জন বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া নিজস্ব দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯ জন। গত ২০ জানুয়ারি ছিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এই সময়ের মধ্যেও বেশ কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি। এতে বেকায়দায় পড়েছেন মিত্রদলের ৮ প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীক পেয়েও অস্বস্তিতে আছেন ২ জন। কারণ একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় নেতাকর্মীদের একটি অংশ ছুটছেন তাদের দিকে। আবার দলের আরেকটি অংশ সমর্থন করছে মিত্রদলের প্রার্থীকে। ফলে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে মিত্রদের মধ্যে। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ আসনে এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে অনেকটা নির্ভার রয়েছেন। কারণ এ দুটি আসনে বিএনপি প্রার্থী কিংবা বিদ্রোহী নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেতলি প্রতীক নিয়ে বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী হয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এর মধ্যে বগুড়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে এখনো মাঠে রয়েছেন শাহে আলম এবং ঢাকা-১৮ আসনে এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন। এ কারণে বুধবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি-সঙ্গ ত্যাগ করে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মান্না।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তার আসনে ভোটে মাঠে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন। সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে জোটের প্রার্থী করে বিএনপি। তিনি তার দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করছেন। ওই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মামুনুর রশীদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মুফতি জুনায়েদ আল হাবিবকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সমর্থনে লড়ছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের আরেক নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী। এই আসনেও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ২ নেতা নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন।
একইভাবে শরিকদের ছেড়ে দেওয়া যশোর-৫, ঢাকা-১২, ঝিনাইদহ-৪ আসনেও বিএনপির বহিষ্কৃতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি শেষদিকে এসে মিত্রদের সঙ্গে সমঝোতা ভালোভাবে করতে পারেনি। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এছাড়া বিএনপি আদর্শিক প্রজ্ঞারও পরিচয় দিতে পারেনি। এই সত্যতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমার আসনে থাকা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করেছে দলটি। বহিষ্কার করার পর যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আর কিছু করার সুযোগ নেই দলটির। তিনি বলেন, কিছুটা অসন্তোষ আছে, তারপরও আমি নির্বাচনি মাঠে আছি। কারণ বিএনপির নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গেই কাজ করছেন।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থী জোনায়েদ সাকি যুগান্তরকে বলেন, আমরা একটা জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যুগপৎ ধারায় কাজ করছি। সেখানে বিভিন্নভাবে সমঝোতা হয়েছে। যেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে সেগুলোতে এখনো কিছু সমস্যা আছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও যতটুকু সমঝোতা হয়েছে, তার ভিত্তিতে একটা ঐকমত্য রক্ষা করা দরকার। সেই জায়গায় আমরা জোর দিয়েছি। জাতীয় পুনর্গঠনের ন্যূনতম যে জাতীয় ঐকমত্য সেটার ওপর প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর যুগান্তরকে বলেন, অসন্তোষের জায়গা তো অবশ্যই আছে। কারণ ৩০০ আসনে নির্বাচন করার অবস্থা আমাদের ছিল। আমরা তো বিএনপির জন্য পুরো দলকেই কুরবানি দিয়ে দিয়েছি। মিত্রদের অনেকের মধ্যে এটা নিয়ে ক্ষোভ আছে। দু-একটি আসন ছাড় দিলেও সেখানে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে। এটা বিএনপির এক ধরনের সাংগঠনিক দুর্বলতা। তারা তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিত্রদের আসন থেকে সরাতে পারেনি। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়।