Image description

ঠিকাদার কাজই শুরু করেনি, অথচ ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার অফিশিয়াল ডকুমেন্ট প্রস্তুত, যা সার্টিফাই বা সত্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রস্তুত করা এই ডকুমেন্ট অভিজ্ঞতাপত্র হিসাবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে আরও একাধিক বড় ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার দরপত্রে। চাঞ্চল্যকর এমন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ে।

সূত্র জানায়, অভিনব এমন মিথ্যা তথ্য সংযুক্ত করেন আহলান সুমন তালুকদার। তিনি চয়ন অ্যাসোসিয়েটস নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রতিষ্ঠানের নামে টাঙ্গাইল ও জামালপুরে ১৭টি ব্রিজের রেট্রোফিটিংয়ের কাজে অংশ নিতে দরপত্র দাখিল করা হয়। এতে অভিজ্ঞতা হিসাবে ফরিদপুর রোডে কার্যাদেশ পাওয়া চারটি ব্রিজের ৭০% কাজ শেষ করার তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবে যা পুরোপুরি মিথ্যা।

প্রতিষ্ঠানটি টাঙ্গাইল রোড ডিভিশনের আওতায় ১৬টি ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ-বাহাদুরঘাট মহাসড়কে অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সমর ব্রিজের রেট্রোফিটিং কাজের দরপত্রে অংশ নেয়। কাজ পাওয়ার জন্য অভিজ্ঞতা বাড়াতে এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এমন মিথ্যাচার করেন সওজের ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা। দরপত্রের নথিপত্রে বিল পরিশোধের সিএমএস (সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) দাখিল করেন। অফিশিয়ালভাবে এই ‘সিএমএস’ হচ্ছে কাজের বিল পরিশোধের ডকুমেন্ট। দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে পূর্বে এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতাপত্র জমা দিতে হয়। নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা এই সিএমএস দিয়ে থাকেন। সিএমএসে স্বাক্ষর করেন সওজের ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুর রহমান ও সহকারী প্রকৌশলী এসএম রফিকুল ইসলাম। দাখিলকৃত সিএমএসে জেলার ভাঙ্গা-ফরিদপুর রোডে ৪টি ব্রিজে রেট্রোফিটিং কাজের বিপরীতে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসকে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো ওই এলাকায় মাধবপুর, পুখুরিয়া, বাসাগাড়ি ও মানিকনগর ব্রিজ নামে পরিচিত।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙ্গা থেকে ফরিদপুরের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। এই সড়কেও পিচ ঢালাই বা কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। সড়ক মেরামত কাজের সঙ্গে চারটি ব্রিজ শক্তিশালী (রেট্রোফিটিং) করার আরও একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেন নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার। চারটি ব্রিজে রেট্রোফিটিংয়ে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকা। দরপত্রে চয়ন অ্যাসোসিয়েটস ও ইলেকট্রিক লিমিটেড জয়েন্টভেঞ্চার (জেবি) ১০ পার্সেন্ট লেস দিয়ে ১১ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭৪ টাকায় কাজটি সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেয়। এরপর সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে ১৭ নভেম্বর কাজটি আলোচ্য যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। একই দিন প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে কাজটি ২০২৭ সালের ১১ মের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে গত দেড় মাসে শুধু চার ব্রিজের নিচে বেড়ে ওঠা গাছগাছালি ও বন পরিষ্কার করা হয়। তবে বাহ্যিকভাবে ব্রিজ চারটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়নি। অথচ দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটিতে দেড় মাসের মাথায় ঠিকাদারকে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধ করার ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয় সিএমএসে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে-চয়ন অ্যাসোসিয়েটস ও ইলেকট্রিক লিমিটেড যৌথভাবে কাজটি পেলেও ফরিদপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে প্রথম বিলের এই সিএমএস ইস্যু করা হয়েছে শুধু চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের নামে।

জানতে চাইলে ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আসলে ৭০% বিল পরিশোধের সিএমএস দেওয়া হয়নি। জামালপুর ও টাঙ্গাইলের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থাপিত দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় আনুষঙ্গিক নথিপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে বলে দেব এগুলো সঠিক নয়।’

তবে ফরিদপুর সওজের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তা ৭০% বিল পরিশোধের সিএমএসে স্বাক্ষর দিয়েছেন। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত করলেই এগুলো বের হয়ে আসবে। ধরা পড়ে যাওয়ায় এখন তারা অস্বীকার করছেন। তিনি বলেন, স্বাক্ষর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে সব বেরিয়ে আসবে। চয়ন অ্যাসোসিয়েটকে জামালপুর ও টাঙ্গাইলের ১৭টি ব্রিজের কাজ দিতেই এমন জালিয়াতি করা হয়। এর সঙ্গে সওজের গোপালগঞ্জ জোনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও জড়িত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চয়ন অ্যাসোসিয়েটসের মালিক আহলান সুমন তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি মিথ্যা কোনো তথ্য দরপত্রে দাখিল করিনি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সওজের রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিকরুল হাসান তার মামা নন। তাকে মামা পরিচয় দিয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছেন না।’ এর একদিন পরই জালিয়াতির সব তথ্য স্বীকার করে ঠিকাদারের পক্ষে প্রতিবেদকের কাছে ক্ষমা চান জনৈক প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে ২০১৮ সালে একটি ছাত্র সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পরিচয় দিয়ে বলেন, বিগত ১৫ বছর তারা কোনো দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি। চলমান দরপত্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তারা ফরিদপুরের চারটি ব্রিজের চলমান রেট্রোফিটিংয়ের কাজের ৭০% বিল পরিশোধের সিএমএস জালিয়াতি করেন। একপর্যায়ে নিউজ বন্ধ করতে প্রতিবেদককে সরাসরি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

সাধারণভাবে বললে পূর্বে নির্মিত ব্রিজ বা ভবনকে না ভেঙে শক্তিশালী বা ঝুঁকিমুক্ত করতে নতুন কিছু সংযোজন করার ক্ষেত্রে প্রকৌশলীরা নাম দিয়েছেন ‘রেট্রোফিটিং’। সংস্কারমূলক এই কাজের মাধ্যমে পুরোনো স্থাপনার স্ট্রাকচার রেখেই লোড নেওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরি করা হয়। এই কাজ সম্পন্ন করতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদারের পাশাপাশি দক্ষ প্রকৌশলীও প্রয়োজন।

সওজের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রেট্রোফিটিংয়ের এসব কাজ সিন্ডিকেট করেই করা হয়। প্রয়োজনের তুলনায় টেন্ডারে অধিক পরিমাণে টাকা ধরা হয়। ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রকৌশলীরা যৌথভাবে পরিকল্পনা করেই প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। বিগত সরকারের সময়ে এই রেট্রোফিটিং কাজকে নেতাকর্মী লালন-পালন কর্মসূচি বলা হতো। যেসব ঠিকাদার কাজ করেন তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ভাগাভাগি করেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এর আগে দরপত্রের নথিপত্র জাল করে প্রায় ৭০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে মন্ত্রণালয়। এদের অধিকাংশ এখনো দরপত্রে অংশ নিতে পারছে না।