Image description
ভারতীয় কূটনীতিকদের ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর ৩ সপ্তাহ। এই সময়ে এসে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশনের কূটনীতিক ও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সমালোচনার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের দূতাবাস থাকলেও এখন পর্যন্ত ভারতই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশাল একটি দল দেশে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এখানে নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো অসন্তুষ্টি নেই বলেও ইইউ ইতোমধ্যে জানিয়েছে। সেখানে নিরাপত্তার আশঙ্কার কারণ দেখিয়ে ভারতের এমন সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ বিষয়ে বহির্বিশ্বে নেতিবাচক ধারণা দেওয়ার কৌশল হিসাবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই মঙ্গলবার এক খবরে জানায়, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় কর্মকর্তাদের পরিবারকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য বাংলাদেশকে ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ হিসাবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তা ঘোষণা করা হয়নি বলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের অধীনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনসহ বাংলাদেশে থাকা পাঁচটি মিশনেই ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং হবে। এগুলো হলো-ঢাকার হাইকমিশন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে অবস্থিত চারটি সহকারী হাইকমিশন।

এদিকে ভারতের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে হিন্দুস্তান টাইমসকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে উগ্র ও চরমপন্থি গোষ্ঠীর হুমকি এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে কর্মকর্তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে ভারতের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, তারা (ভারত) নিরাপত্তার কথা তুলেছে। এ মুহূর্তে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো ইস্যু বাংলাদেশে নেই, উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও নেই। তাদের মিশনে কোনো হুমকিও বাংলাদেশে কেউ দেয়নি। নির্বাচনকে সামনে রেখে কল্পিত বা ধারণাগত কোনো বিষয় থেকে সতর্কতা হিসাবে এটি হয়তো তারা করেছে। তিনি বলেন, এটি একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কথাবার্তা হচ্ছে। এমন একটা ধারণা বাইরের পৃথিবীতে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের অবস্থা বুঝি খুব ‘ডিফিকাল্ট’। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। কূটনীতিকদের পরিবার ঠিক কবে নাগাদ ভারতে ফিরবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। নীতিগত একটি অবস্থান ভারত ঘোষণা করেছে। আমাদের দিক থেকে তাদের আশ্বস্ত করার কোনো সুযোগ থাকলে সেটা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে বলে মনে করি।

ভারতের এই ধরনের সিদ্ধান্তকে নির্বাচনের পরিবেশকে আঘাত হানতে চাওয়ার অংশ হিসাবে উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। ভারতীয় দূতাবাসের কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদের ওপর কোনো আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। অথচ বাংলাদেশ যখন একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার সংবাদ এসেছে গণমাধ্যমে। এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি উদাহরণ। তারা আমাদের নির্বাচনের পরিবেশকে আঘাত হানতে চায়। কারণ তারা দেখছে এখানে তাদের সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেই। এখন যারাই ক্ষমতায় আসুক তারা ভারতের অবৈধ স্বার্থ রক্ষা করবে না, তারা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তাই এখন থেকেই তারা এই নির্বাচনের বিষয়ে অনাস্থা সৃষ্টি করতে চায়। এই কারণেই এমন পদক্ষেপ বলে মনে করি।

তিনি বলেন, দেশে ৫০টির বেশি দূতাবাস আছে। কেই এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না ভারত ছাড়া। সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ হলে অন্যরাও কথা বলত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশাল দল দেশে এসেছে, তারা নির্বাচনে সহযোগিতা করছে। ভারত বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের আক্রমণের কথা বলেছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা তো বাংলাদেশের নাগরিক, ভারতের নাগরিক নয়। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সবাই নির্যাতিত হচ্ছে। তাদের দেশের সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের বিষয়গুলো ধামাচাপা দিতে বারবার বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের কথা বলে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এটি ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি করবে। আমরা মনে করি, দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ঠিক আছে। কূটনীতিকদের পরিবারের জন্য ‘হার্মফুল’ কিছু বাংলাদেশে নেই।

ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এ নিয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ভারতের এমন সিদ্ধান্তের খবর এসেছে।