
দেড় যুগ ধরে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সফলতা পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনের সময় মামলার শিকার হন লাখ লাখ নেতাকর্মী। গুম-খুনের শিকার হন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু নেতা ছিলেন একেবারেই নিষ্ক্রিয়। কেউ করেছেন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য আবার অনেকে দীর্ঘদিন ছিলেন বিদেশে। এসব সুবিধাভোগী হাইব্রিড নেতা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকা। থাকছেন বিএনপির মিছিল-মিটিংয়ের একেবারে সামনের সারিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীরা।
দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিএনপির সুদিন ফিরে আসায় অনেক সুবিধাবাদী দলে ভিড়তে শুরু করেন। নির্বাচনের ঘোষণা আসার পর থেকে নতুন নতুন নাম শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগের আনুকূল্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন কিংবা আন্দোলনের সময় নিরাপদে বিদেশে ছিলেন, তারাই এখন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন। এদের কেউ হতে চান এমপি আবার কেউ পেতে চান বড় পদ। হঠাৎ সামনে আসা এসব নেতাকর্মী বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন। কমিটি গঠনে অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। উপজেলা, পৌর, থানা ও ইউনিয়ন কমিটিতে তারা আওয়ামী লীগের দোসরদের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের পাওয়া যায়নি, তাদেরই এখন দলে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির অপকর্মকারীদের মধ্যে তাদের সংখ্যাই বেশি। তারাই দখল, টেন্ডার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দলের ত্যাগী ও দুঃসময়ের নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। হাইব্রিড নেতাদের এমন দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। ইতোমধ্যে অনেক নেতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, জুলাইয়ে আন্দোলন চলাকালে অনেককেই সেভাবে দলের কার্যক্রমে দেখা যেত না। এমনকি শেখ হাসিনা পালানোর আগেও যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন, তারা এখন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের ‘কাছের লোক’ হয়ে থাকেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড। তৃণমূলে নির্দেশনা দিয়ে হাইব্রিডদের দলে জায়গা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হাইব্রিডরা বিএনপিতে ঢুকছেন, তাদের খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আপনার পেছনে এখন অনেক ঘুঘু ঘুরঘুর করছে। এই ঘুঘুদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এই ঘুঘুরা কারো নয়, এরা কেবল নিজের স্বার্থই বোঝে। তারা আসবে, আপনাকে ব্যবহার করবে, আপনার সুনাম নষ্ট করবে নিজের স্বার্থ আদায়ের জন্য। দলের সুনাম নষ্ট করে নিজের স্বার্থ আদায় করে আবার দলের দুঃসময়ে পালিয়ে যাবে। এই ঘুঘুরা যাতে নিজের স্বার্থে দলে আসতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগীদের দলে আশ্রয় না দিতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু তা অমান্য করে সুবিধাভোগীদের ঠাঁই দিচ্ছে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা।
আওয়ামী সুবিধাভোগীদের দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক আনিসুল হকের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের সময় রাতের ভোটের সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের অন্যতম সহযোগী শাহ মো. শাজাহানের নাম সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। শাহ মো. শাজাহানের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিতর্কিত এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় তাকে আর বিএনপিতে জায়গা দেওয়া হয়নি।
গত ১৫ বছরে শাজাহান আওয়ামী লীগের এমপি রতনের হয়ে এলাকায় ঠিকাদারি, বালুর ব্যবসা এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ ফেরিঘাট ১০ বছর নিয়ন্ত্রণ করেন। ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় প্রশাসনের কাছে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামের তালিকা পাঠাতেন। সে অনুযায়ী বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হতো।
ফ্যাসিস্টের দোসরদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক গণমাধ্যমের শিরোনামও হয়েছেন আনিসুল হক। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কৃষক দলের আহ্বায়ক আনিসুল হকের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অবস্থান না থাকলেও ৫ আগস্টের পর এলাকায় সক্রিয় হন। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় তিনি এসে ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতেন। পটপরিবর্তনের পর তিনি আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের নিয়ে এলাকায় অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীর হাতে বিএনপি নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হয়েছেন, আওয়ামী লীগের সেসব নেতাকে এখন আশ্রয় দিচ্ছেন তিনি। বিশেষ করে অবৈধ বালু ও পাথরের ব্যবসা করে হাজার কোটি হাতিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় গণযোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক শাহ রুবেলকে আশ্রয় দিয়েছেন। তার কারণেই বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতা আজ অসহায় হয়ে পড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আনিসুল হক আমার দেশকে বলেন, একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। শাহজাহান আমাদের বিএনপির কর্মী। দলীয় কর্মী হিসেবে সে আমাদের প্রোগ্রামে আসে। তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে না আছে, তার কিছু জানি না।
এদিকে আওয়ামী লীগের বিশেষ সুবিধায় ব্যবসা করা স্মার্ট টেকনোলজির চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করতে চান। অথচ তিনি হাসিনার আশীর্বাদে আওয়ামী লীগের পুরো সময়ে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সঙ্গে চীন সফরেও গিয়েছিলেন। এছাড়া এইচটি ইমাম, মোস্তাফা জব্বার, জুনায়েদ আহমেদ পলক ও নাফিসা কামালের সঙ্গেও ছিল তার বিশেষ যোগাযোগ। তার বিরুদ্ধে নাফিসা কামালের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, জহিরুল পদ্মা সেতু উদ্বোধনে শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার ছাপান আর এখন তারেক রহমানের ছবি দিয়ে পোস্টার করছেন। সম্প্রতি তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সদস্য হওয়ার জন্য ফরম সংগ্রহ করেন। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করে তার আবেদন বাতিল করা হয়।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জেল আহমেদ বলেন, ‘জহিরুল ইসলাম গত বছরের ডিসেম্বরে এসে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি দলের সদস্য হতে আবেদন করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকজনের অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, তিনি ফ্যাসিবাদের দোসর ছিলেন। আমরা তার আবেদন বাতিল করি।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে জহিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমি ছাত্রদলের রাজনীতি করতাম। বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেওয়ার জন্য আবেদন করলে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে তা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি আমি জেলা বিএনপিকে জানিয়েছি। তারা আমাকে দ্রুততম সময়ের মধ্য দলের সদস্য করে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের চিহ্নিত দোসররা এখন টাকার বিনিময়ে বিএনপিতে প্রবেশ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নিলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সুযোগসন্ধানী কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকে বিএনপিতে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটে গাইবান্ধা জেলায়।
অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়া এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিএনপির জেলা কমিটির সহসভাপতির পদ দেওয়া হয়। আর এ পদের জন্য ফ্যাসিস্টের অন্যতম দোসর ব্যবসায়ী নাহিদুজ্জামান নিশাদ বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিময় করেন, যা নিয়ে প্রতিবেদন করে দৈনিক আমার দেশ। বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাজানি হলে নিশাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় বিএনপি। তবে নিশাদের কাছ থেকে বিএনপির যেসব নেতা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্য যান আনোয়ার হোসেন খোকন। পরে সেখানে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত হন। এখন তিনি অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকার সাংগঠনিক সমন্বয়কসহ বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও কখনো চাঁদপুরের স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতাকর্মীদের কোনো খোঁজ না নিলেও এখন তিনি চাঁদপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে একদিনের জন্য দেশে আসেননি তিনি। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে এসে টাকার বিনিময়ে চাঁদপুর মেহের ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন খোকন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির এক নেতা জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ প্রবাসে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন খোকন। তিনি বাংলাদেশে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নেতাকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে তার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলে বিভিন্নজনকে পদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার হোসেন খোকন আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক কারণে অনেকে আমার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেন। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আর স্থানীয় বাসিন্দারা আমার বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা কথা বলার কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে মেহের ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ থেকে অপসারণ করেছে।
সাবেক যুবদল নেতা মাসুমুল হক বাগেরহাট সদর আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ছেলে রাহাত মালেক ও শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই বাগেরহাট-১ আসনের সাবেক এমপি শেখ হেলালের পিএস ফিরোজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, তামাম করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মাসুমুল হক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সুম্পর্ক বজায় রেখে স্বাস্থ্য খাতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন। হাসিনার আমলে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, বার্ন ইনস্টিটিউটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মেডিকেল কলেজের সরঞ্জাম কেনাকাটায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। ওই সময় তিনি হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের পুরো সময় তিনি সৌদি আরবে নিরাপদে ছিলেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক যুবদল নেতা মাসুমুল হক আমার দেশকে বলেন, বিএনপি করার কারণে আওয়ামী লীগের সময় ঠিকমতো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারিনি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ছেলের সঙ্গে ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার সঙ্গে আমার কখনো পরিচয় হয়নি। এছাড়া শেখ হেলাল বা তার পরিবারের কারো সঙ্গে আমার কখনো পরিচয় ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা কুষ্টিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এমপি হওয়ার পর ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি বিএনপির সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে ভোটের আগের দিন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে তিনি এলাকায় ছিলেন। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মামুন বিশ্বাসের পক্ষে সরাসরি ভোট করেছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে রাখালদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ৪১টি মহিষ লুট হয়। ওই ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। যারা ওই ঘটনায় সম্পৃক্ত, তারা রেজা আহমেদ বাচ্চুর অনুসারী বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে রেজা আহমেদ বাচ্চু আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করছে। আমি কখনোই রাজনীতির মাঠে নিষ্ক্রিয় ছিলাম না। এখনো আমি সক্রিয়।
ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুল আলম ফারুখের অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে নয়াপল্টন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। গত ৪ আগস্ট জমা দেওয়া ওই লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ফারুখকে আহ্বায়ক করে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু ২০২২ সালের আগে কখনো তিনি বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। ফারুখের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। গত তিন বছরে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে একটি সভাও করতে পারেননি। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি দিতে পারেননি।
নির্বাচন ঘিরে বিএনপিতে মৌসুমি নেতাদের দৌরাত্ম্য নিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমার দেশকে বলেন, আমাদের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর রক্ষার জন্য আঁতাত করে চলেছেন- এটা মিথ্যা নয়। কিন্তু আমরা দেখব সে আঁতাত করে চললেও দলের জন্য কতটুকু অবদান রেখেছে। যদি কোনো অবদান না থাকে, তাহলে তাদের বিএনপিতে আসতে দেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগ করছে, এখন বিএনপি থেকে এমপি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চোধুরী আমার দেশকে বলেন, এতদিন আওয়ামী লীগ করছে, এখন বিএনপি করবে, এটা সম্ভব নয়। মানুষ যদি আওয়ামী লীগ থেকে এখন বিএনপির এমপি হতে চায়, তাহলে দলে এটি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন সুযোগ বিএনপিতে নেই।
তিনি আরো বলেন, বিএনপিতে কারা হাইব্রিড আর আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্কিয় ছিল, এটা আমাদের সবার জানা আছে। দল আগামীতে ভেবেচিন্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। যারা ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রেখেছে, দল আগামীতে তাদেরই মূল্যায়ন করবে।
নিষ্ক্রিয়দের চাপে সক্রিয়রা
এদিকে সুবিধাভোগীরা যখন পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন, তখন বঞ্চিত করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা নেতাদের। তেমনই একজন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শফিকুল ইসলাম ছালাম। তিনি আমার দেশকে বলেন, গত ১৭ বছরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা, মামলা ও নির্যাতনে দিশাহারা ছিলাম। ১৭ মামলায় আসামি হয়ে কোর্টের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘুরেছি, ব্যবসা হারিয়েছি। আর শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আমাদের কোণঠাসা করছে সুবিধাভোগীরা। এতদিন আন্দোলন-সংগ্রামের সময় যারা বিদেশে ছিলেন বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে চলেছেন, তারা এখন দলের বড় নেতা। অথচ আমাদের মতো ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুর দলে ফেরা নিয়ে আলোচনা ছিল দীর্ঘদিন ধরে। ৪৪ বছর ধরে খুলনার বিএনপিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু । ১৯৭৯ সালে ছাত্রদলকর্মী হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করে ১৯৯২ সাল থেকে ১৭ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০৯ সাল থেকে একযুগ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মহানগর বিএনপির তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটি থেকে বাদ পড়েন মঞ্জু ও তার অনুসারীরা। ওই সময় দলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে শোকজ করা হয় তাকে। পরে ২৫ ডিসেম্বর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ স্থগিত করা হয় ।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও তিনি কখনো নেতাকর্মীদের ছেড়ে যাননি। আন্দোলন-সংগ্রাম ও মামলায় নেতাকর্মীদের জামিনে সার্বক্ষণিক তাদের পাশে ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুথানে খুলনায় তার নেতৃত্ব মাঠে ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এদিকে, বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদে পুনর্বহাল বা আরো বড় পদে তাকে মূল্যায়ন করার প্রত্যাশা ছিল স্থানীয় নেতাকর্মীদের। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিএনপির সুসময়ে তাকে দলে যথাযথ সম্মান না দেওয়ায় হতাশ নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু আমার দেশকে বলেন, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গতানুগতিক রাজনীতি থেকে বের হয়ে এসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজনীতি করতে হবে। জনগণ অপেক্ষা করছে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুনভাবে রাজনীতি করবে। সেক্ষেত্রে ভালো মানুষ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন করবে। ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাদের মূল্যায়ন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী হাবিবুল বাসার। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ এ সময়ে তিনি বৃহত্তর সূত্রাপুর থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন ৩০ বছর। পরে ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্ব নেন। এখন বিএনপির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সহসম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় নেতাদের দাবি, দলের দুঃসময়ে মাঠে থেকে লড়াই করেছিলেন কাজী হাবিবুল বাসার। এ সময় তার বিরুদ্ধে ১৪৪টি ‘মিথ্যা মামলা’ হয় এবং বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকলেও সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়নি বিএনপিতে। তবে আগামীতে সঠিকভাবে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মূল্যায়ন করার প্রত্যাশা স্থানীয় নেতাকর্মীদের।
নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা প্রকৌশলী একেএম আমিরুল মোমিন বাবলু। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে নোয়াখালীর হাতিয়ায় যখন বিএনপির কেউ কথা বলত না, কোনো কর্মসূচিতে থাকত না। তখনো প্রায় দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে নিজ বাড়িতে হাতিয়া উপজেলা বিএনপির অঘোষিত কার্যালয় চালু করেন প্রকৌশলী বাবলু। অসংখ্য কর্মসূচি সেখানে পালিত হয়। অথচ দলে এখন তার কোনো পদ নেই। দীর্ঘ এ সময়ে দলীয় নেতাকর্মীসহ স্থানীয় অসংখ্য অসহায়-দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি।
বাবলু আক্ষেপ করে আমার দেশকে বলেন, ‘আমি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে দেখে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পরে বিএনপির রাজনীতিতে আসি। আমি কোনো সুবিধা নিতে রাজনীতিতে আসিনি। বরং দলের ব্যানারে দেশ-জাতির জন্য কিছু করতে চাই।’
বিএনপির ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা এসএম মোশারেফ হোসেন। প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর কমিটিতে সমবায় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও ২০২২ সালের কমিটিতে কোনো পদে রাখা হয়নি তাকে। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থেকে চারটি মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলাম। আন্দোলন-সংগ্রামের ত্যাগীদের যেন যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে দলের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়।’