Image description

২০ আগস্ট, ২০২৫, ভারত ঘোষণা করেছে যে তারা ওড়িশার প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে অগ্নি-৫ মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে পরীক্ষা চালিয়েছে। সংস্কৃত ভাষায় ‘আগুন’ অর্থের এই ক্ষেপণাস্ত্রের দৈর্ঘ্য ১৭.৫ মিটার, ওজন ৫০ হাজার কেজি এবং এটি এক হাজার কেজির বেশি পারমাণবিক বা প্রচলিত ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। প্রায় ৩০ হাজার কিমি/ঘণ্টার হাইপারসনিক গতিতে পাঁচ হাজার কিমি অতিক্রম করতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রটি বিশ্বের দ্রুততম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মে মাসে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে চার দিনের সংঘর্ষের সময় ভারতের দ্বারা উন্মোচিত প্রতিরক্ষা দুর্বলতাগুলো পূরণ করার লক্ষ্যে পাকিস্তান একটি নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) গঠনের ঘোষণা দেয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরই অগ্নি পরীক্ষাটি করা হলো। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য পাকিস্তান নয়, বরং সেই প্রতিবেশী দেশ, যার সাথে নতুন দিল্লি আবার সতর্ক সম্পর্ক গড়ে তুলছে- দেশটি হলো চীন।

 

অগ্নি-৫ এশিয়ার অনেক অঞ্চল, চীনের উত্তরাঞ্চল এবং ইউরোপের কিছু অংশকে আঘাত করার ক্ষমতা রাখে। ২০১২ সাল থেকে এটি দশমবারের মতো পরীক্ষা করা হলো এবং এর সময়সূচি বিশেষ অর্থ বহন করে। এটি ঠিক মোদি-চীনা সামিটের আগে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সীমান্ত সংক্রান্ত তিক্ততার পর দুই দেশের সম্পর্কের শীতলায়ন লক্ষ্য করা গেছে।

চীনের প্রতি ভারতের কৌশলগত দৃষ্টি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নি-৫ মূলত চীনের দিকে লক্ষ্য রেখে উন্নয়ন করা হয়েছে। সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের বিশিষ্ট ফেলো ম্যানপ্রীত সেথি বলেন, ‘অগ্নি-৫ হলো পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার মূল উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক প্রতিরক্ষা তৈরি করা। পাকিস্তানের সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।’

ভারত-পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা

পাকিস্তান সম্প্রতি ফাতাহ-৪ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছে, যার পাল্লা ৭৫০ কিমি। ভারত অগ্নি-৬ নিয়ে কাজ করছে, যা ১০ হাজার কিমি পর্যন্ত পাল্লা রাখবে এবং একাধিক স্বতন্ত্র লক্ষ্যভিত্তিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের সম্মানীয় লেকচারার মানসুর আহমদ বলেন, ‘অগ্নি-৫ পরীক্ষার মাধ্যমে ভারতের সাবমেরিন-নির্গত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার প্রযুক্তিগত প্রদর্শন ঘটেছে।’

ভারতের দু’টি পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন বর্তমানে সেবা দিচ্ছে, আরো দুটি নির্মাণাধীন। পাকিস্তানের দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সাবমেরিন নেই। পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র্রের উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউজের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এটিকে ‘উদীয়মান হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। অন্যদিকে, ভারতের বৃদ্ধি পাচ্ছিল এমন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে প্রায় উদ্বেগজনক নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ‘২০০৮ সালে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি) থেকে প্রাপ্ত ছাড়-একটি ৪৮ দেশের ক্লাব যা পারমাণবিক উপাদান ও প্রযুক্তি বিক্রি করে- ভারতকে এনপিটি-এর স্বাক্ষরকারী না হলেও বৈশ্বিক পারমাণবিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছিল, যা ভারতের বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চীনও এর লক্ষ্যভূমিতে রয়েছে। এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত চীনের দিকে নজর রেখে মধ্য ও দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যেখানে পাকিস্তান মূলত প্রতিরক্ষা ও ভারত-কেন্দ্রিক কৌশল অনুসরণ করছে।