
পতিত সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে দীর্ঘদিন অনুমোদনহীন ছুটি কাটানো বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক সাহেদা পারভীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এরইমধ্যে পুরো ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে গেলে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হবে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর সাধারণ ছুটির জন্য একটি দরখাস্ত দিয়ে কলেজে আসা বন্ধ করে দেন শিক্ষিকা সাহেদা পারভীন। চার মাস পর কলেজ কর্তৃপক্ষকে তিনি একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি চিকিৎসার প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন উল্লেখ করে আরও দুই মাসের ছুটির দাবি করেন। মানবিক দিক বিবেচনায় ওই আবেদন গ্রহণ করে তাকে বাড়তি দুই মাসের ছুটি দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সূত্রে আরও জানা গেছে, আবেদন অনুযায়ী জুন মাসে সাহেদা পারভীনের কলেজে যোগদানের কথা থাকলেও তিনি এই সময়ের মধ্যে ফিরে না এসে নতুন করে একটি দরখাস্তে ছুটি বাড়ানোর আবদার করেন। কিন্তু সেই ছুটি আর মঞ্জুর করেননি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে গত ছয় মাস ধরে সাহেদা পারভীন বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
কলেজের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, ছুটির নামে সাহেদা পারভীন নাগরিকত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এতে করে তিনি নিয়মানুযায়ী বেতনভাতাও পাচ্ছিলেন। তবে তার বিদেশে অবস্থান বৈধ পন্থায় না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ শেষ ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেনি।
এমনকি বিদেশে অবস্থান করে ছুটি দেখিয়ে অবসরে যাওয়ার আবেদনও করেছিলেন সাহেদা। তা না হলে বিভিন্ন অজুহাতে তিনি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ছুটি বাড়ানোর আবদার করেন কীভাবে। কারণ তার ২০২৭ সালের জুন মাসে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হবে। সেক্ষেত্রে তিনি অবসরকালীন পূর্ণ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পাওয়ার উপযুক্ত হবেন।
সূত্রটি আরও জানিয়েছেন, বিদেশে থেকে অবসর পর্যন্ত ছুটি কাটিয়ে বেতনসহ অন্যান্য সুবিধাদি নেওয়ার উদ্দেশ্যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন সাহেদা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সে আশা আর পূরণ হচ্ছে না।
চাঁদপাশা মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ তাহমিনা আক্তার বলেন, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিদেশে গেছেন সাহেদা পারভীন। তারপরেও চিকিৎসার কথা শুনে কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। যে কারণে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে আবেদন মঞ্জুরের প্রেক্ষিতে তিনি ছয় মাসের ছুটি কাটিয়েছিলেন। কিন্তু তৃতীয় আবেদনে যখন তিনি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ছুটি চান, তখনই আমাদের সন্দেহ হয়। পরে খোঁজখবর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তার স্থায়ী হওয়া এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বেতন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়, তাই বেতনভাতা আটকানোর কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে অধ্যক্ষ আরও বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত সাহেদা পারভীনের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বিষয়টি সামনে আসায় পরে তার নতুন ছুটির আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। বরং কাজে যোগদানের জন্য তাকে পরপর তিনটি নোটিশ দেওয়া হয়। সেসব নোটিশের কোনো উত্তর তিনি দেননি বা দেশেও ফেরেননি।
সর্বশেষ চলতি মাসের ১১ আগস্ট অনুষ্ঠিত কলেজ গভর্নিং কমিটির সভায় সাহেদা পারভীনকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। তারপরেও তিনি না আসায় ও বিনা ছুটিতে আরও দুই মাস অনুপস্থিত থাকায় গত ২০ আগস্ট সাহেদা পারভীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একইসাথে কেন তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, কমিটির প্রধান নিয়মানুযায়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নয়তো তার মনোনীত ব্যক্তি থাকবেন। সেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুর রউফকে মনোনীত করেছেন। আমরা তাকে এরইমধ্যে পত্র দিয়েছি। তিনি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তার তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সেক্ষেত্রে সাহেদা পারভীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্তের সিদ্ধান্ত দেবে বোর্ড। এখানে আমাদের কারও কিছু করার সুযোগ নেই।
অপরদিকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সাহেদা পারভীনের নাগরিকত্ব গ্রহণ সংক্রান্ত সব প্রমাণ কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। পাশাপাশি সাহেদা পারভীন তার চাকরি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার খবর শুনে বাংলাদেশে এসেছেন বলে খবর পাওয়ায় তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে চাঁদপাশা মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ তাহমিনা আক্তার বলেন, আমরাও শুনেছি চাকরি চলে যেতে পারে এই খবরের সাহেদা পারভীন বাংলাদেশে এসেছেন। তবে সে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় নিয়মানুযায়ী এ বিষয়ে তিনি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছেন না।
অপরদিকে কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি এইচএম তসলিম উদ্দিন বলেন, প্রায় এক বছর এভাবে অননুমোদিত ছুটি কাটানোর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আমরা বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অবহিত করেছি। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বিষয়টির অনুসন্ধান করছে। তদন্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গমন এবং সেখানকার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রমাণ মেলার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে এক বছরের বেতনভাতা বাবদ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন সাহেদা পারভীন।