কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিচ্ছে না চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচনে দলটির সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থান এবং তাদের সংরক্ষিত ‘ভোটব্যাংক’ প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় সমীকরণের পাশাপাশি প্রতিটি দল ও প্রার্থীর বিবেচনায় জোরেশোরে আসছে ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের’ হিসাব-নিকাশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দলটির এই রিজার্ভ ভোট নির্বাচনের মূল ফলের হিসাব সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। ফলে এই বিশাল ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপক তৎপরতা ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রচারে না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে অন্যতম নির্ধারক হিসেবে রয়ে গেছে তাদের রিজার্ভ ভোটব্যাংক। কারণ জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা দলটির ভোটার কিংবা সমর্থকরা বিলীন হয়ে যায়নি। নির্বাচনে চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই নীরব ভোটব্যাংকটিই এখন তুরুপের তাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে নিজ দলীয় ভোটব্যাংকের পাশাপাশি যে প্রার্থী কৌশলগতভাবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে নিজের পক্ষে টানতে পারবেন, নির্বাচনি দৌড়ে তার জয়ের সম্ভাবনা থাকবে বেশি। এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাজ শুরু করেছেন অনেক প্রার্থী। কীভাবে তাদের ভোট টানা যায় কষছেন সেই হিসাব। গোপনে ও কৌশলে তারা ভোটের সমীকরণও মেলাচ্ছেন। সমর্থক আকৃষ্ট করার চেষ্টায় দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও দেখা গিয়েছিল এমন চিত্র।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনের ভোটের সমীকরণের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে মেলানো সমীচীন হবে না। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ যখন সম্পূর্ণ দলীয়করণ করেছিল তখনো কিন্তু বিএনপি ভোটে অংশ নিয়ে অনেক জায়গায় জয়লাভ করেছে। যেমন দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম যতবার দাঁড়িয়েছে ততবারই জয়লাভ করেছে। সুতরাং এলাকায় জনপ্রিয়তা, প্রার্থীর ক্লিন ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে তেমন কোনো দুশ্চিন্তার কারণ হবে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড ১৭ বছর ধরে মানুষ দেখেছে। তাদের অপছন্দ করেছে। ফলে ভোটের হিসাবে তেমন প্রভাব পড়বে না।
বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান বিভিন্ন নির্বাচনে খুব বেশি না থাকলেও কিছু নির্বাচনে তা উল্লেখযোগ্য হয়েছে। বিতর্কমুক্ত চার নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বিএনপি ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, ২০০১ সালে বিএনপি ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও আওয়ামী লীগ ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ৪৯ শতাংশ ও বিএনপি ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পায়।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো আগের রাতেই ভোট গ্রহণের অভিযোগ তোলে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ হিসেবে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
এই তিনটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ৭২ শতাংশ, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ ৭৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ ও বিএনপি ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ৬৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। জাতীয় রাজনীতির এই সমীকরণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের অবস্থান, স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের প্রভাব এবং বিভিন্ন প্রার্থীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্বাচনী সমীকরণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্বাচনে কারা এগিয়ে থাকবেন, সেই আলোচনায় আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের দিকে নজর রাখছে সব দল।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোটের রাজনৈতিক প্রয়োগ ইউনিয়ন বা পৌরসভা কিংবা উপজেলাভেদে ভিন্ন হতে পারে। দলটির ভোটব্যাংক সব জায়গায় একইভাবে কাজ করবে, এমন নয়। কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থক-ভোটারদের একটি অংশ নির্দিষ্ট প্রার্থীর দিকে ঝুঁকলে তার জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সমর্থন যেসব এলাকায় বেশি সেখান বেশি প্রভাব পড়বে। আবার অন্য এলাকায় দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জয়ের নির্ধারক হবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। দলটির অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপি ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পায়। এর আগে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সর্বোচ্চ ভোটের হার ছিল ১৯৯১ সালে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। ফলে নির্বাচনে জামায়াতের ভোট বৃদ্ধির পেছনে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন ভূমিকা রেখেছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। অনেকের ভাষ্যমতে, জাতীয় নির্বাচনে অনেকে আসনেই নীরবে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের ভোটাররা। সেই বিবেচনায় ইউপি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের অবস্থান ভোটের হিসাব-নিকাশের চিত্র বদলে দিতে পারে। কোনো এলাকায় তারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করলে ভোটের ফলে তার প্রভাব পড়তে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অবশ্য মনে করেন, বিগত সময়ের পরিস্থিতি আর বর্তমান সময় এক নয়। তার মতে, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের ভোটটা ছিল একতরফা, কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনের ভোট নয়। এখানে জামায়াত প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব পায়নি। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে তাদের (আওয়ামী লীগ) সেই ভোটব্যাংক আর নেই। ফ্যাসিবাদ মনোভাবের কারণে অনেকে দলটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে নির্বাচনে আগের মতো আর প্রভাব ফেলবে না। তিনি কালবেলাকে আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় কোনো ভোট নয়। এখানে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, ক্লিন ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততা কাজ করবে। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক কোনো প্রভাব ফেলবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের মতো দলগত অবস্থানের হিসাব তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না। ভোটের মেরূকরণে স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। ভোটের মাঠে স্থানীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বেশি বিবেচনা করবে ভোটাররা। ভোট সব দিকেই পড়বে।
সারা দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে ইসি। পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু হবে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি। আর শেষ ধাপ ২৭ মে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকহীন হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখার আইনি সুযোগ কমিশনের নেই। ফলে চাইলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ যে কোনো দলের কর্মী-সমর্থকরা অংশ নিতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ইউপি নির্বাচনে স্থানীয় সম্পর্কের প্রভাব অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। চেয়ারম্যান ও সদস্য (মেম্বার) পদে প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, এলাকার সমস্যা সমাধানে অতীতে তাদের ভূমিকা এবং স্থানীয় বিরোধের মতো বিষয় ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশ্য তারা এও বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় ভোটেও ধর্মের ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণাও ভোটের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে এলাকাভিত্তিক এআই জেনারেটেড অনেক মিথ্যা খবর বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এতে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক নয়। জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই চেষ্টা থাকবে, এটা স্বাভাবিক বিষয়। বিষয়টি এলাকাভিত্তিক কিছু জায়গায় জয়-পরাজয়ের ওপর প্রভাব ফেলত পারে, তবে সব জায়গায় নয়।
তার মতে, স্থানীয় নির্বাচনে এলাকার প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রাখে। কারণ তৃণমূলে একজন আরেকজন চেনেন, জানেন। কোন এলাকায় কে বেশি কাজ করছে তাও তারা জানেন। তাই জাতীয় নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এতটা প্রভাব ফেলবে না।