Image description

প্রকৃতিগতভাবেই খুলনাকে নিরিবিলি এক শান্তির শহর বলা হতো। প্রাকৃতিক রিসোর্সসমৃদ্ধ, সামাজিক বন্ধনে অটুট, ধুলোবালিহীন নগরী খুলনাকে শান্তির শহর হিসাবে বিবেচনা করা হতো। মাঝখানে এরশাদ শিকদারের হাত ধরে কিছু দিন অশান্ত হয়ে উঠে খুলনা।

১৯৯৯ সালে এরশাদ শিকদার গ্রেফতার হওয়ার পর দীর্ঘদিন শান্ত ছিল খুলনা। সেই শহর এখন খুনাখুনিতে অশান্ত হয়ে উঠেছে। গেল ৯ মাসে ৬৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যেখানে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের, সেই পুলিশকে রাতে একা চলাচলে নিষেধ করেছেন স্বয়ং পুলিশ সুপার। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কথায়-কথায় দিনদুপুরে বীভৎসভাবে কোপানো হচ্ছে প্রতিপক্ষকে।

প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সাবরেজিস্ট্রারের মতো সরকারি কর্মকর্তাকেও। মাদক চোরাচালান, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নতুন গজিয়ে ওঠা মহল্লাভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন, নীরব চাঁদাবাজি তো আছেই। বলাবলি হচ্ছে-খুলনায় সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর এমন উত্থান আগে হয়নি। কথা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদার সঙ্গে। তিনি বলেন, শান্তির শহর খুলনায় মানুষ শান্তিতে নেই।

সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। মানুষের কথার আগে গুলি চলছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, সরকারি কর্মচারী, সাধারণ মানুষ-সবার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে আরও ডিপ্লোম্যাটিক ও কঠোর হতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবেই এই সন্ত্রাসের রাজত্ব থেকে মুক্তি মিলবে।

নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারের রিকশাচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, কয়েকদিন আগে রাত ১টার দিকে নিরালার মোড়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ি। রাতে যা কামাই করেছিলাম, সব নিয়ে গেছে। ৩৬ বছর রিকশা চালাই। রিকশাচালকের কাছ থেকে ছিনতাই হয়েছে শুনিনি কখনো। গত সপ্তাহে দুইজন সরকারি কর্মকর্তার ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় মানুষ আরও আতঙ্কিত বোধ করছে। বুধবার ভরদুপুরে খুলনা সদর সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমারকে তার কার্যালয় থেকে তিন যুবক জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় শহরজুড়ে হুলুস্থুল পড়ে যায়। আধা ঘণ্টা পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অপহরণকারীদের মধ্যে লোহাপট্টির কসাই লিটনকে দেখা গেছে। তিনি খুলনার অন্যতম সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর টিমের প্রভাবশালী সদস্য এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। ঘটনার পর মুখ খুলছেন না সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার। থানায় কোনো অভিযোগও করেননি। রোববার এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই বলতে চাই না। পুলিশ তদন্ত করে দেখুক।

এদিকে রূপসা থানার এক পুলিশ সদস্য শাহ আলম সম্প্রতি ডিউটি থেকে ফেরার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গুরুতর জখম হন। ছিনতাইকারীরা তাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এ সময় তার কাছ থেকে নগদ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঢাকায় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনার পর খুলনার পুলিশ সুপার পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নোটিশ জারি করেছে।

এ দুই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। শনিবার দুপুরে সদর থানার কাশেমনগর এলাকায় আশিকুজ্জামান জনি নামে এক যুবককে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। সেও এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। খুলনা থানার ওসি লোকমান হোসেন বলেন, দু-একদিনের মধ্যে গ্রেফতারের খবর দিতে পারব।

খুলনা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। খুলনা মহানগরী ও জেলায় নয় মাসে ৬৬টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নগরীতে ৩৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে হুমকি-ধমকি ও চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়ে নগরীর থানাগুলোয় অভিযোগের সংখ্যা ঠেকেছে হাজারে। এর আগে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী দেড় বছরে ৯১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হত্যাকাণ্ড যে বেড়েছে, তা নয়। একই সঙ্গে বেড়েছে চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। নগরবাসী এখন সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে আরও দূরদর্শী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই ছাড় না পায়। পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সম্মিলিত সামাজিক সচেতনতা ও অপরাধবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি।

ভয়-আতঙ্কে মানুষ : চাঁদাবাজি নিয়ে কথা হয় নগরীর খানজাহান আলী রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আব্দুল হাকিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। অপরপ্রান্তের ব্যক্তিটি বলেন, আমি গ্রেনেড বাবুর লোক। এই মাসে এক লাখ টাকা দিবি। না হলে ব্যবসা বন্ধ রাখবি।

বিষয়টি নিয়ে আমি আর থানায় যাইনি। ১৫ আগস্ট রাত ৯টার দিকে সন্ত্রাসী আশিক গ্রুপের সদস্য আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে গ্রেনেড বাবুর লোক। পুলিশ জানায়, গ্রেনেড বাবু গ্রুপের লোকজন তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় নিহতের মা নাসিমা বেগম মামলা করেন। ওই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয় গ্রেনেড বাবু। মামলা না তোলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিন পর জয় ঢালীর বাবা আক্তার ঢালীকে হত্যা করা হয়।

কথা হয় রূপসা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সামান্য ঘটনায়ই খুনাখুনি বাড়ছে। রূপসা উপজেলা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। পথ চলতে অনিরাপদ বোধ করছি। পুলিশ সেভাবে কাজ করছে না। ফলে মানুষের মধ্যে আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে ব্যবসায়িক নেতা সোহাগ দেওয়ান বলেন, ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন মহলকে চাঁদা না দিলে ঠিকভাবে ব্যবসা করা যায় না। পুলিশও সেভাবে কাজ করে না। আমরা শঙ্কিত।

পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসীগোষ্ঠী : খুলনা শহর ও এর আশপাশে অসংখ্য সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ।

গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে বেপরোয়া গ্রেনেড বাবু গ্রুপ। তারা বি কোম্পানি নামে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে। পাড়া-মহল্লায় উঠতি বয়সি যুবকদের টার্গেট করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে গড়ে তুলছে। এদের লাগানো হচ্ছে মাদকের কাজে। সর্বোচ্চ বেতন ধার্য করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা, সর্বনিম্ন ৭ হাজার। এরা রুট পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে মাদক পৌঁছে দেয়।

নিম্ন-আয়ের পরিবার বা বস্তি এলাকার উঠতি বয়সি কিশোর ও যুবকদের টার্গেট করে এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। দেনা-পাওনা নিয়ে ঝামেলা হলে প্রাথমিকভাবে হুমকি-ধমকি। এতে কাজ না হলে খুন পর্যন্ত করা হয়। মাদক বিক্রির টাকার লেনদেন নিয়েও অসংখ্য খুনের ঘটনার প্রমাণ পুলিশের হাতে রয়েছে। খুলনার রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলাকে ডেঞ্জার জোন হিসাবে উল্লেখ করেছেন খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।

তিনি বলেন, গেল ৯ মাসে রূপসায় ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় ৪টি ও বটিয়াঘাটায় ৩টি। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এম শাকিলুজ্জামান বলেন, সন্ত্রাসী তৎপরতা হঠাৎই বেড়েছে, বিষয়টি এমন নয়। গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময় থেকেই এটির অবনতি। সেটা এখন কমতির দিকে। আমরা ৯০ শতাংশ হত্যা মামলার সমাধান করে ফেলেছি। বাকিগুলোও সমাধানের দিকে। একই সঙ্গে নিয়মিত আসামি গ্রেফতার হচ্ছে। তবে মানুষ কম সচেতন হওয়ায় সন্ত্রাসীদের অবস্থান অথবা তাদের কর্মতৎপরতা নিয়ে তথ্য দেয় না। এছাড়াও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে সন্ত্রাসীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সেগুলোও সমাধানের চেষ্টা চলছে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমদে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে পার হচ্ছে এসব অস্ত্র। আমরা এদের নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করছি। সন্ত্রাসীদের যেসব বাহিনী গড়ে উঠেছে সেগুলোর বেশির ভাগই গ্রেফতার হয়েছে। দু-একজন দেশের বাইরে থেকে অপারেট করে শহরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আমরা অচিরেই তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেব।