পরিবারের আর্থিক দৈন্যদশা মেটাতে ও মায়ের উন্নত চিকিত্সার খরচ যোগাতে গত বছরের জানুয়ারির ১৮ তারিখ সৌদি আরব যান ২২ বছরের মুন্নি। তবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে ফিরেন আসেন মুন্নি। তবে নিথর দেহে। ডেথ সার্টিফিকেট ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তার মৃত্যু হয়েছে আত্মহত্যায়। তবে পরিবারের দাবি, বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন মুন্নি। প্রতি বছর মুন্নির মতো হাজারো নারী ভালো জীবনের আশায় বিদেশে গেলেও অনেকেই দেশে ফেরেন কফিন বন্দি হয়ে।
বিদেশে যাওয়া বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গেলেও বিদেশ যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় অনেকে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়েন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার মতো পরিস্থিতিতে পড়েন অসংখ্য নারী।
অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে,
বাড়ছে ফেরত আসা মৃত শ্রমিকের সংখ্যাও
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ২০২৫ সালের আট মাসের তুলনায় ৫ হাজার ২১৪ জন বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। যা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী গেছেন। তাদের ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরব ও জর্দানে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৩ নারী কর্মী। একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীর মরদেহ। এর মধ্যে আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন ৮৪ অভিবাসী নারী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো এসব আত্মহত্যার ৭৬ শতাংশ ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২৫ জন নারী শ্রমিদের মরদেহ দেশে আসে।
ব্র্যাকের মাইপ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় অংশের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) গবেষণা অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হন। চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হন ৯৭ শতাংশ এবং ৯৭ শতাংশ সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ২০২১ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৯ নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে আসে। ২০২২ সাল ছিল ১০৯ মরদেহ। দেশে ২০২৩ সালে ফেরত আসে ১০১ নারী শ্রমিকের মরদেহ। ২০২৪ সালে দেশে ফেরত আসে ৯৫ নারী শ্রমিকের মরদেহ।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও বিজ্ঞজনেরা যা বলেন
সৌদি আরবে আত্মহত্যা করা মুন্নী আক্তারের বোন সুক্কুরি বেগম বলেন, তিন বোনের মধ্যে মুন্নি সবার ছোট ‘নানাবাড়িতে আমরা কষ্ট করে তিন বোন বড় হইছি। আমার মা চোখে দেখে না। ডায়াবেটিস ও মানসিক সমস্যাও আছে। মায়ের চিকিত্সা করবে এ আশা নিয়ে মুন্নী বিদেশে গেছিল। কিন্তু যাওয়ার কদিনের মধ্যেই মৃত্যুর খবর পাই। সবশেষ যখন কথা হয় বলছিল আমারে এখান থেকে নিয়া যাও। শুনছি আমার বোন নাকি গলায় ফাঁস দিয়া মারা গেছে। বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ‘ডেথ অব ফিমেল মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ইন ডেস্টিনেশন কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে আসা নারী কর্মীদের মরদেহের ৭৯ শতাংশই গৃহকর্মী। আর ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লেখিত মৃত্যুর কারণ ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই পরিবার বিশ্বাস করে না। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, কেন বিদেশে গিয়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে কিংবা মারা যায় তা বের করা জরুরি।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জমান ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিদিন ২০-২২টি প্রবাসী শ্রমিকের লাশ আসে। সপ্তাহে ২ বা ৩টা নারী শ্রমিকের লাশ থাকে। তাদের নিবন্ধনকৃত শ্রমিকের লাশ দাফনের জন্য তারা বিমানবন্দরে পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা দেন। পরে মারা যাওয়া শ্রমিকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। তবে নিবন্ধন করা না থাকলেও তারা সহযোগিতা করেন। মৃত শ্রমিকের পরিবারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয় প্রশ্ন করা হলে—মো. আসাদুজ্জমান ১২ দেশে ২২টি আইন সহযোগিতা দেওয়ার সংস্থা আছে। তারা অভিযোগ করলে, তদন্ত সেই দেশেই হয়। তখন তাদের তদন্ত ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমাদের কিছু বলার থাকে না।