মারণনেশা ভয়ংকর কুশ মাদক দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংঘবদ্ধ একাধিক আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি চক্র বিদেশ থেকে নতুন প্রজন্মের এই ভয়ংকর মাদক এনে দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান বলেন, ‘থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র বাংলাদেশে কুশ মাদকের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। নতুন প্রজন্মের এই মাদক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’
ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক তরুণীকে আটক করা হয়। সে নিজেও কুশ সেবনে আসক্ত।
ডিএনসির এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে কুশ নিয়ে আসছে থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি চক্র। থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্কককেন্দ্রিক কিছু মাদক কারবারি এই মরণ মাদক সরবরাহ করছে। তাদের কাছ থেকে কুশ ঢাকায় নিয়ে আসছে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক। তাদের সহযোগিতায় রয়েছে বাংলাদেশের চার-পাঁচজন। এদের এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
ডিএনসি সূত্র বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশে কুশ মাদক আনা শুরু হলেও ২০১৭-১৮ সালেও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে কুশ মাদক জব্দ করা হয়েছিল। কুশ মূলত উচ্চমাত্রার টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) যুক্ত। এতে সাইকো-অ্যাক্টিভ উপাদান, বিশেষ করে টিএইচসির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। ফলে এর প্রভাব অত্যন্ত তীব্র। অতিরিক্ত কুশ ব্যবহারে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডিএনসি ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অন্য মাদকের চেয়ে কুশ গ্রহণের ভয়াবহতা অনেক বেশি। কুশ গ্রহণ করলে বোধশক্তি লোপ পায়। এই মাদক গ্রহণে দ্রুত লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যায়।
তিন মাসে ছয় চালান জব্দ : গত তিন মাসে কুশের ছয়টি চালান জব্দ করা হয়েছে। এর বাইরে আরো চালান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢুকেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে পাঁচটি পৃথক অভিযানে ৩০ কেজি কুশের পাঁচটি চালানসহ আন্তর্জাতিক চক্রের ভারতীয় তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে ডিএনসি। থাইল্যান্ড থেকে নিয়মিত দেশে কুশের চালান নিয়ে আসছে এই চক্র।
ডিএনসি সূত্র বলছে, ভারত থেকে থাইল্যান্ডে ফ্রি ভিসায় উড়োজাহাজে অল্প খরচে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্রটি। গ্রেপ্তার ভারতীয় নাগরিকরা থাইল্যান্ডের চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখান থেকে কুশ সংগ্রহ করেছিল। পরে বাংলাদেশে নিয়ে এসে এখানকার সহযোগীদের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
ডিএনসি সূত্র জানায়, এর আগেও তিনটি চালানের সঙ্গে পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় আরো কয়েকজন কুশ কারবারে জড়িত। ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে দেশীয় চক্র কুশ নিয়ে খুচরা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে। কুশের বেশির ভাগ ক্রেতা অভিজাত ঘরের সন্তান।
সর্বশেষ গত বুধবার দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী হলের গ্রিন চ্যানেল এলাকায় শাড়ির আড়ালে কৌশলে বাংলাদেশে কুশ মাদক নিয়ে আসার অভিযোগে অভিজিৎ দাস নামের এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি।
গ্রেপ্তার অভিজিৎ দাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা। তার কাছ থেকে চার কেজি ২৮০ গ্রাম কুশসহ অন্য মাদক জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার অভিজিৎ আন্তর্জাতিক ও ত্রিদেশীয় মাদক পাচার চক্রের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসির এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টার দিকে ব্যাঙ্কক থেকে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩২১ ফ্লাইটে আসা অভিজিৎ দাসকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে তার ট্রাভেল ট্রলি তল্লাশি করা হয়। এ সময় কাপড়ের নিচে কৌশলে লুকানো অবস্থায় কুশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একটি ভারতীয় পাসপোর্ট, দুই হাজার ১৬০ ভারতীয় রুপি, ৭০ থাই বাথ, একটি স্মার্টফোন, বোর্ডিং কার্ড এবং তিনটি ভারতীয় শাড়ি জব্দ করা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিজিৎ দাস ডিএনসি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সে বনগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের একজন কুলি। ত্রিদেশীয় একটি মাদক পাচার চক্র ভারতের নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্ককে নিয়ে যায়। পরে ভারতীয় শাড়িসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে বাংলাদেশে মাদক পাচার করে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা বাংলাদেশে দু-তিন দিন অবস্থান করে মাদকের চালান হস্তান্তরের পর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে যায়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বিমানবন্দর থানায় ডিএনসির বিমানবন্দর সার্কেলের পরিদর্শক শাহরিয়া শারমিন মামলা করেছেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুশ মাদকসহ গত জুলাই মাসে জুলফিকার নামের এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে কুশের বিস্তারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের বেশ কয়েকজনের নাম বলে। তবে তারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
পৃথক অভিযানে আরো পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি জানতে পারে, গ্রেপ্তার ভারতীয় নাগরিকরা ব্যাঙ্কক থেকে কুশ মাদক সংগ্রহ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
এর আগে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আবদুল কাদের শেখ নামের আরেক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে তার কাছ থেকে তিন কেজি কুশ জব্দ করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ডিএনসি জানতে পারে, সে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্কক গিয়ে ঢাকায় কুশের চালান নিয়ে আসে। তার তথ্য মতে, প্রতি কেজি কুশের দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত ১৮ আগস্ট শাহজালাল বিমানন্দর থেকে চার কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। তাতে জড়িত ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পাণ্ডে সে সময় পালিয়ে যায়।
এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাঁচ কেজি ১২০ গ্রাম কুশসহ আব্দুল রহমান (৪৬) ও মোহাম্মদ ইকবাল আনসারী (৪৫) নামের আরো দুই ভারতীয় নাগরিকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। জানা গেছে, ব্যাঙ্কক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আসা দুই ভারতীয় নাগরিককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষী এবং বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার সামনে তাঁদের ট্রাভেল ট্রলি তল্লাশি করে কাপড়ের নিচে লুকানো পাঁচ কেজি ১২০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। এঁরা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সদস্য।
আবার গত ৬ আগস্ট বিজিবি সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে ১২ কেজি কুশসহ তারিকুজ্জামান নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে বিজিবি জানতে পারে, চালানটি ভারত যাচ্ছিল।
২০২২ সালে সাবেক র্যাব রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে প্রথম কুশের চালান জব্দ করে। পরে র্যাব জানতে পারে, তিনি ওই কুশ মাদকসেবীদের কাছে সরবরাহ করে আসছিলেন। অভিজাত এলাকার পার্টিগুলোতে কুশের চালান সরবরাহ করতেন তিনি।