১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য-উপাত্ত। এই হত্যাকাণ্ডের পর মেজর (অব.) মোজাফ্ফর দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন ভারতে। সেখানেই জন্ম নেয় তার দুই সন্তান। অথচ পরবর্তীতে সেই সন্তানদের বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট—কীভাবে হলো। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের পলাতক সেই মোজাফ্ফরই কীভাবে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে এতোদিন দায়িত্ব পালন করলেন। কারা তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিল। কীভাবে তিনি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও ওঠাবসার সুযোগ পেলেন। মোজাফ্ফরের ব্যবহৃত একটি আইফোনের ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় বিশদ ও কৌশলগত ‘জেরা রূপরেখা’। সেই রূপরেখা ধরেই ১৩ ও ১৪ই সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন প্রসিকিউটর ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা।
মানবজমিন’র হাতে আসা নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোজাফ্ফরের ব্যবহৃত জব্দ করা অ্যাপল-২৫৯৫ মডেলের আইফোন থেকে প্রায় ৪.৭০ গিগাবাইট লজিক্যাল এক্সট্রাকশন ডেটা বিশ্লেষণ করে ৩২৬টি কন্টাক্ট, ১৬৩টি কল হিস্ট্রি, ৪ হাজার ৯৬৯টি বার্তা, ১৬০টি চ্যাটরুমসহ বিপুল পরিমাণ মিডিয়া আর্টেফ্যাক্টের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মুছে ফেলা ৪০টি খুদে বার্তা ও একাধিক মিডিয়া লগ। এসব ডিজিটাল আলামতের সূত্র ধরে প্রথমদিনের জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফ্ফরের কাছে অর্ধশতাধিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রয়োজনে আবার তাকে জিজ্ঞাবাদ করা হতে পরে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন সূত্র। এখন প্রশ্ন— ডিজিটাল ডিভাইস থেকে উদ্ধার হওয়া এই তথ্য-উপাত্ত কতটা নতুন সূত্রের জন্ম দিচ্ছে, মুছে ফেলা বার্তাগুলোতে কী তথ্য রয়েছে এবং দীর্ঘদিনের আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সেগুলোর তাৎপর্যই বা কতটা। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা।
প্রসিকিউটর জোহা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফ্ফরের সঙ্গে রক্ষী বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছেন। ধানমণ্ডিতে তার কোর্সমেটের বাসায় এবং অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী অফিসারদের সংগঠন ‘রাওয়া ক্লাবে’ নিয়মিত আড্ডা দিতেন মোজাফ্ফর। খুনের দায়ে সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে অবৈধভাবে ভারতে এবং পরবর্র্তীতে অবৈধভাবে বাংলাদেশে চলে এলেও তাকে কখনো সামরিক-বেসামরিক কোনো গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা আইনশৃক্ষলা বাহিনী চিহ্নিত করতে পারেনি। এছাড়া এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে প্রথমে পরিচয় ও যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে মোজাফ্ফর। পরে, মাসুদ ও মোজাফ্ফরে ফোনের অবস্থান একই স্থানে ছিল এই মর্মে এভিডেন্স দেখানো হয়।
পরে, বিষয়টি স্বীকার করে জানান, তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ এবং ‘রাওয়া ক্লাবে’ সরাসরি দেখা করেছেন তিনি। তানভীর জোহা আরও বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার পরে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যান মোজাফ্ফর। এর প্রায় ৫ বছরের মধ্যে স্ত্রীকেও বৈধ পথেই ভারতে নিয়ে যান তিনি। সেখানে তার দুটো সন্তান হয়। সন্তানগুলো জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও পরে কীভাবে বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট করেছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত সংস্থা। কী প্রক্রিয়ায়, কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। জোহা বলেন, ভারতে পালিয়ে গিয়ে তিনি প্রথমে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই কনস্ট্রাকশনের বিভিন্ন মালামাল তৈরির কারখানা দেন। এদিকে, তদন্তে উঠে আসে ফ্যালকন সিকিউরিটি লিমিটেড নামে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দীর্ঘ বছর কাজ করেছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্থাপনা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় তারা সেবা দিয়ে থাকে।
এমনকি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও সেবা দিয়ে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু মোজাফ্ফরের গ্রেপ্তারের পরে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট থেকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নামসহ কিছু তথ্য সরিয়ে ফেলা হয় বলে জানান প্রসিকিউটর জোহা। এখন প্রশ্ন উঠছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন? খুনের দায়ে সেনাবাহিনী থেকে পলাতক এই ব্যক্তির অতীত পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা কোনো গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল কিনা। এই খুনি কীভাবে অবসরপ্রাপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিশে গেলেন। নাকি রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ মহলগুলোর তত্ত্বাবধানেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে তদন্ত সংস্থা।
তানভীর জোহা বলেন, জিয়াউর রহমানকে সার্কিট হাউজ থেকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এনে দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করা হবে। এমন একটি মিটিং এ মোজাফ্ফর নিজে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন। সাবেক কর্নেল মতিউর রহমানের নেতৃত্বে গভীর রাতে কালুরঘাট ব্রিজের কাছে একটি পাহাড়ে নিয়ে জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে এনে চাপ সৃষ্টির ব্যাপারেই ব্রিফ করা হয়েছিল। মোজাফ্ফর তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উপ-সহকারী এডজুটেন্ট ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন। সার্কিট হাউজে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদেরও একজন ছিলেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের সময় তার অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছিলো। এবং হত্যাকাণ্ডের পরদিন এসব অস্ত্র উদ্ধার করে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নেয়া হয় বলে জানান প্রসিকিউটর জোহা।
মোজাফ্ফরকে যেসব প্রশ্ন করেছে তদন্ত সংস্থা: মোজাফ্ফরের ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণের পর তার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি বিস্তারিত প্রশ্নমালা তৈরি করে তদন্ত সংস্থা। শুরুতেই ডিভাইসটির মালিকানা ও ব্যবহারের বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করা হয়—ফোন ও সংশ্লিষ্ট সিম নম্বরগুলো তিনি এককভাবে ব্যবহার করতেন কি না, ডিভাইসের পাসকোড ও অ্যাপল আইডি অন্য কারও জানা ছিল কি না এবং একই নম্বরের সঙ্গে অন্য কোনো হ্যান্ডসেট বা সংযুক্ত ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছিল কি না। তদন্তকারীদের লক্ষ্য ছিল, পরবর্তীতে অন্য কারও ব্যবহারের দায় দেখিয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকারের কোনো সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা।
এরপর ১৯৮১ সালের ২৯শে মে সন্ধ্যা থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রামের সার্কিট হাউস ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাকে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হয়। জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর ও সার্কিট হাউসে অবস্থানের তথ্য তিনি কীভাবে বা কার মাধ্যমে পেয়েছিলেন, সার্কিট হাউসের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নকশা সম্পর্কে তার আগে থেকে কোনো ধারণা ছিল কি না, ২৯শে মে রাতে কার সঙ্গে তার বৈঠক বা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হয়েছিল এবং ঘটনার সময় তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কে ছিলেন—এসব বিষয় জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে ঘটনার সময় তিনি নিজে কী জানতেন এবং কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেটিও জিজ্ঞাসাবাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের অপারেশন কাঠামো ও চেইন অব কমান্ড নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। অপারেশনের উদ্দেশ্য তাকে কীভাবে জানানো হয়েছিল, কার কাছ থেকে তিনি ব্রিফিং পেয়েছিলেন, অস্ত্রের উৎস কী ছিল, সংশ্লিষ্ট সহকর্মীরা কারা ছিলেন এবং ঘটনার পরপরই তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়া হয়। তদন্তকারীরা এসব তথ্যের সঙ্গে ১৯৮১ সালের ঘটনার অন্যান্য নথি ও সাক্ষ্যের মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন। ফরেনসিক বিশ্লেষণে ‘মেজর এএম নেসার উদ্দিন’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে মোজাফ্ফরের হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার বিষয়টিও জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্ব পায়। নেসার উদ্দিনের সঙ্গে তার ১৯৮১ সালের সময়কার কিংবা পরবর্তী সময়ের কোনো পেশাগত বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল কি না, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত কোনো পুরনো সামরিক নথি, ছবি বা তথ্য তাদের মধ্যে আদান-প্রদান হয়েছে কি না এবং পূর্বে দেয়া বক্তব্যের সঙ্গে ডিজিটাল রেকর্ডে পাওয়া বার্তা ও কলের কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফরেনসিক পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মুছে ফেলা ৪০টি বার্তা ও সংশ্লিষ্ট মিডিয়া। তদন্তকারীরা জানতে চান, এসব বার্তা নিয়মিতভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল, নাকি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা, যোগাযোগ কিংবা তদন্তের আশঙ্কায় তা মুছে ফেলা হয়। কোনো রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে আলোচনার পর বার্তাগুলো মুছে ফেলা হয়েছিল কি না, কিংবা ডিসঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ ব্যবহারের পেছনে কী কারণ ছিল—এসব প্রশ্নও করা হয়। প্রাথমিক বক্তব্য নেয়ার পর ডিজিটাল রেকর্ড সামনে রেখে মুছে যাওয়া কথোপকথন ও ভিন্ন নামে সংরক্ষিত কন্টাক্টের বিষয়ে তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এ ছাড়া ১৯৮১ সালের ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের সঙ্গে এখনো কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের শেষ পর্যায়ে তদন্তকারীরা তাকে সরাসরি জানতে চান—৩০ মে ১৯৮১-এর ঘটনা সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য তার জানা আছে কি না, যা তদন্তকারীদের এখনো জানা নেই; এবং সেই তথ্য যাচাই করতে কোন ব্যক্তি, নথি বা সূত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রসিকিউটর জোহা বলেন, মোজাফ্ফরের বক্তব্যকে শুধু অনুমান বা মৌখিক দাবির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে না। তার জবানবন্দির সঙ্গে আইফোন থেকে পাওয়া ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, কল ডিটেইল রেকর্ড, বার্তার তথ্য, মিডিয়া ফাইল ও মেটাডেটা মিলিয়ে দেখা হবে। মুছে ফেলা বার্তাগুলোর তথ্য পুনরুদ্ধার ও যাচাইয়ের কাজও চলছে। এসব তথ্যের পারস্পরিক মিল-অমিল বিশ্লেষণ করেই তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।