ইরানের চারপাশ আবার ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। দৃশ্যত নতুন করে সেনা, যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে রণপ্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে এসব মোতায়েনের মাধ্যমে তিনি ইরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন কিনা তা-ও স্পষ্ট নয়। এমনও হতে পারে, ইরানের সঙ্গে চুক্তির দরকষাকষিতে দেশটিকে মানসিক চাপে রাখতে তিনি এ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য বলেছেন, তারা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের দাবি, নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। সেই নির্বাচনে নিজের পতনশীল ইমেজ কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প এমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারেন। এরই মধ্যে ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। আল-জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে সংঘাত আরও বাড়ানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পথই বিবেচনা করছে উভয় পক্ষ। আরও কয়েক হাজার মার্কিন সেনাও মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এই সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিচালনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সর্বশেষ সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এর মাধ্যমে ইরানবিরোধী যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দেখে নেয়া যাক।
কী কী সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে?
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি বহর রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এর একদিন পর রওনা হয়েছে মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ)। এতে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বিমানবাহী রণতরি বহর ও অন্যান্য নৌবাহিনীর মোতায়েনে সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে পারে। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরি বহর ও অন্যান্য জাহাজে নিয়োজিত নাবিক ও মেরিন সেনারাও রয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দু’টি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে। তিনি বলেন, এভাবে বিপুল সামরিক শক্তি একত্রিত হলে ডনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত বিকল্প থাকবে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, এ নতুন মোতায়েনে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও সামরিক শক্তি যুক্ত হবে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে নুরি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই অগ্রসর হোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প ‘টেবিলে রাখা’ই এই মোতায়েনের লক্ষ্য। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো সামরিক সরঞ্জাম বা সেনা সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী সেই যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই কী ধরনের সেনা ও সামরিক শক্তি রয়েছে?
কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সেনা মোতায়েন হয় ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে।
লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে মার্কিন যুদ্ধ সেনা পাঠানো হয়েছিল। একপর্যায়ে লেবাননে প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা মোতায়েন ছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল। তারা বড় স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি অঞ্চলটির বিভিন্ন ছোট অগ্রবর্তী সামরিক ঘাঁটিতেও মোতায়েন ছিল। চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প। প্রথম দিকে তিনি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরিসহ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ আরব সাগরে পাঠান।
যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল?
ওপেন সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষক এবং সামরিক বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানশক্তির এটি সবচেয়ে বড় আকস্মিক বৃদ্ধি। মোতায়েন করা বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস) বিমান, এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত এফ-২২ যুদ্ধবিমান। এর পাশাপাশি এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও রয়েছে।
বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিমানের অনেকগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে গেছে। এগুলোর সঙ্গে কার্গো বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানও রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিয়মিত সেনা বা বিমান পরিবর্তনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দেয়। মার্চে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এই অতিরিক্ত সেনারা তিনটি পৃথক সামরিক ইউনিটে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি ইউনিটের উৎস, যাত্রাপথ ও মোতায়েনের সময় ছিল আলাদা। প্রথমটি ছিল ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। এর নেতৃত্বে ছিল আমেরিকা শ্রেণির উভচর হামলাজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ)।
দ্বিতীয়টি ছিল বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। এর কেন্দ্র ছিল ওয়াস্প শ্রেণির উভচর হামলাজাহাজ ইউএসএস বক্সার এবং ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থান করছিল। এই দু’টি মেরিন ইউনিট মিলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক যুক্ত করেছে। তৃতীয় ইউনিটে ছিল উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থানকারী ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার সেনা। এই এয়ারবোর্ন পদাতিক বাহিনী মূলত প্যারাশুটের মাধ্যমে হামলা চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত। সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
সর্বশেষ সেনা মোতায়েন কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
নতুন করে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে যুদ্ধ আরও তীব্র করার কোনো পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা আরও বাড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, আমি আপনাকে সেটা বলতে পারি না। কারণ দেখুন, আপনি তো জানতে চাইছেন- কোথায় বোমা ফেলতে যাচ্ছেন?
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির কৌশল হিসেবেও এই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। গত সপ্তাহে ইরান সাতদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার একটি নতুন প্রস্তাব পাঠায়। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানায় তেহরান। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দেয়া। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় আসুক। এরপরই কোনো শর্তে সম্মত হতে চায় ওয়াশিংটন।