নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই তুলে দিতে বদ্ধপরিকর সরকার। বইয়ের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর দেওয়া হয়েছে ছাপাখানাগুলোকে। তারপরও মুনাফার অতি লোভে কলঙ্কিত শিশুর পাঠ্যবই। নিম্নমানের কাগজ ও কালি ব্যবহার, বই কাটিংয়ে কারচুপি, অনুমোদিত প্রেসের বাইরে গোপনে বই ছাপানোসহ নানা অনিয়মে ইতোমধ্যে অর্ধ শতাধিক ছাপাখানার প্রায় চার কোটি ফর্মা বাতিল করে ধ্বংস করা হয়েছে। দফায় দফায় শোকজ করা হয়েছে দেড় ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠানকে। মানহীন বই ছাড় দেওয়ায় ইন্সপেকশন এজেন্সিকেও দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিস। এরপরও অনিয়মের লাগাম টানা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে এবারও বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্পন্ন বই পৌঁছে দেওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, ২৮, বাংলাবাজার ঠিকানা ব্যবহার করে প্রাথমিকের ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৪ কপি বইয়ের কাজ পেয়েছিল রেদওয়ানিয়া প্রেস। অথচ, প্রতিষ্ঠানটি ডেমরার মাতুয়াইলে নামহীন একটি প্রেসে গোপনে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপাচ্ছিল। মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি টিম এবং ইন্সপেকশন এজেন্সির কাছে বিষয়টি ধরা পরে। এ সময় প্রায় এক লাখ ফর্মার কাগজ ধ্বংস এবং প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ করা হয়। এরপর গত ২২ সেপ্টেম্বরও ফের ওই প্রেস পরিদর্শনে গিয়ে বই কাটিংয়ে কারচুপি ধরা পড়ে। হিসাব অনুযায়ী, সঠিক মান বজায় রেখে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মার পাঠ্যবই ছাপালে সব খরচ বাদ দিয়েও এবার ছাপাখানাগুলোর মুনাফা হবে অন্তত ৭০০ কোটি টাকা। তার পরও অতি মুনাফার লোভে নিম্নমানের বই ছাপার মহোৎসব চলছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, গত মাসে শতাধিক প্রেস পরিদর্শন করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিয়ম পাওয়া গেছে। অনেক প্রেসে বইয়ের প্রথম ৫ থেকে ১০ পাতায় উন্নতমানের কাগজ ব্যবহার করা হলেও ভিতরের পাতায় ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাগজ। এসব অভিযোগে অর্ধ শতাধিক প্রেসের প্রায় চার কোটি ফর্মা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল বই নতুন করে ছাপার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাঠ্যবই ছাপায় গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকায় দায়ে এখন পর্যন্ত রেদওয়ানী প্রেস, মেঘদূত, সাগরিকা, ন্যাশনাল, সরকার, আনোয়ারা, বাংলাদেশ ডিজিটাল, আমিন, দশদিশা, মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, আনন্দ প্রিন্টার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দুই দফায়ও নোটিস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডিকেও কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। নিম্নমানের বইকে ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সময়মতো বই সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা : সূত্র জানায়, শুধু মান নয়, সময়মতো বই সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এনসিটিবির হিসাবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাক্-প্রাথমিকের ৮৫ শতাংশ বই ছাপা শেষ হলেও পিডিআই হয়েছে ৬২ শতাংশের। প্রাথমিকের ছাপা শেষ হয়েছে ৫২ শতাংশ এবং পিডিআই ২৪ শতাংশের। মাধ্যমিকের বই ছাপা শেষ হয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ এবং পিডিআই হয়েছে ৪ শতাংশের। বিপুল পরিমাণ বই পুনঃমুদ্রণ করতে হচ্ছে। নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে গত মাসের মাঝামাঝি। পুনঃদরপত্রে বিভিন্ন লটের কাজের সময়ও বাড়ানো হয়েছে।
জানা গেছে, মাধ্যমিকের ৪০৮ নম্বর লটের কাজ শেষের সময় ৩০ নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে ১০ ডিসেম্বর করা হয়েছে। অথচ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলায় শতভাগ বই পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। অবশিষ্ট বই ছাপা, বাঁধাই, কাটিং, পিডিআই ও পরিবহনের জন্য হাতে আছে দুই মাসেরও কম সময়। ফলে শেষ মুহূর্তে মানহীন বই শনাক্ত হলে তা আবার ছাপার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও বছরের প্রথম দিনে সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছায়নি। শতভাগ সরবরাহের ঘোষণা আসে ৭ ফেব্রæয়ারি। এর আগের বছর সব বই পৌঁছাতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল। শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে বই ছাপাতে গিয়ে ফর্মা বাদ পড়া, বই খুলে যাওয়া এবং একই পৃষ্ঠা দুবার ছাপার মতো ঘটনাও ঘটে। এবার প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপা হচ্ছে ১৩৩টি প্রেসে। এর মধ্যে মাধ্যমিকের ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিকের প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই। দরপত্র হয়েছে ৭০০টির বেশি। দুই শতাধিক দরপত্রে ছিল একক দরদাতা। প্রতিযোগিতা না থাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ৮-৯ শতাংশ বেশি দামে কাজ পেয়েছে। প্রাক-প্রাথমিকের ২৩.৩৩ শতাংশ বই ছাপার কাজ পেয়েছে মাত্র দুটি প্রেস। অন্যান্য শ্রেণির বই ছাপাতেও বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই বেশির ভাগ কাজ : খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক একে অন্যের আত্মীয়। কেউ ভাই, কেউ ভগ্নিপতি, কেউ জামাই। কোথাও আবার একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে অংশ নিয়েছে। বিভিন্ন লটে ১৪-১৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও জমা দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতা না থাকায় বেশি দরে কাজ পায় প্রতিষ্ঠানগুলো।
তার ওপরে এবার শুরু থেকেই কাগজ ও কালির মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠছে। অনুমোদিত কাগজের বদলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর অসংখ্য ঘটনা হাতেনাতে ধরেছে এনসিটিবি। পরীক্ষায় নকল কালি শনাক্ত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে নির্ধারিত মানের কাগজের প্রতি টনের দাম প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেখানে নিম্নমানের রিসাইকেল পাল্পের কাগজ সরবরাহকারী বিসমিল্লাহ পেপার হাউস থেকে ২০ হাজার টাকা কমে বিভিন্ন প্রেস কাগজ কিনছে। বিসমিল্লাহ পেপার হাউসের স্বত্বাধিকারী মিন্টু মোল্লার মালিকানাধীন মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন ও অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং এবার ১০০ কোটি টাকার বেশি পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছে। দুই প্রেসেই নিম্নমানের বই ছাপার প্রমাণ পাওয়ায় শোকজ করা হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, কাগজে ৪% জিএসএম হেরফের স্বাভাবিক। কিন্তু, দেশের হাতেগোনা কিছু বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ কাগজ উৎপাদনকারীর মেশিন ৬০-৭০ বছরের পুরোনো। এগুলোর কাগজের একপ্রান্তের তুলনায় অন্য প্রান্তে ১০-১২ জিএসএম পার্থক্য হয়ে যায়। একই সঙ্গে রিসাইকেল পাল্প ব্যবহার করায় এই পার্থক্য আরও বাড়ে। দাম কম হওয়ায় অনেক ছাপাখানা এসব কাগজ ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে সক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি কাজ নিয়েছে। ফলে তারা সময়মতো বই সরবরাহ করতে পারবে না। এজন্য যেসব ছোট প্রেস অল্প কাজ নিয়ে ছাপা সম্পন্ন করে ফেলেছে, বা সম্পন্নের পথে, তাদেরকে বিলম্ব করতে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। লোডশেডিংয়ের দোহাই দিচ্ছে। শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বই সরবরাহ করলে পরীক্ষা ছাড়া মানহীন বই চলে যেতে পারে। সরকারের উচিত এখনি দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি বলেন, নানা অপরাধে আগের বছর যারা কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল, তারাও এবার বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে। এমন হলে অনিয়ম বন্ধ হবে না। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু বলেন, নিম্নমানের কাগজ, কালি, ছাপা ও বাইন্ডিংয়ের অভিযোগে ১৫-১৬টি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। আরও কয়েকটির নোটিস প্রস্তুত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্পন্ন বই দিতে ব্যর্থ হলে কালো তালিকাভুক্তসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০ অক্টোবরের মধ্যেই প্রাথমিকের বই উপজেলায় চলে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।