রাজধানীর দক্ষিণখানে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর ওপর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, দিনদুপুরে প্রকাশ্যে রড দিয়ে পিটিয়ে ও ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে আহত করা হয়। তাকে বাঁচাতে তার বোনরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও চড়াও হয়ে পোশাক ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করে হামলাকারীরা। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ব্যবসায়ীকে মৃত ভেবে ফেলে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সুমন হাসান মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএ খোকনসহ অভিযুক্ত হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা খোকন। নৃশংস এই হামলার ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার দক্ষিণখান থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। পরে ভিকটিমের বোন শেফালী আক্তার রুনা আদালতে খোকনসহ ৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেন। অন্য অভিযুক্তরা হলেন-সুলতান, ফরহাদ, মিরাজ।
এছাড়াও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, খোকনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ ও তার অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। প্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীর বোন ও মামলার বাদী শেফালী আক্তার রুনা বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘এক বছর আগে আমাদের মা মারা গেছেন। বৃদ্ধ বাবা চোখে দেখেন না, কানেও শোনেন না। আমরা পাঁচ বোন, আর পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমার এই ভাই (ভুক্তভোগী সুমন)। ছোটবেলা থেকেই সে বালু-পাথরের ব্যবসা করে। তার কোনো শত্রু নেই এবং কোনো খারাপ রেকর্ডের কথাও কেউ বলতে পারবে না। এমন মানুষের ওপর হামলার পরও যদি বিচার না পাই, তবে আমাদের বিচার আল্লাহর কাছে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
রুনা আরও বলেন, মেইন রাস্তায় শত শত মানুষের সামনে আমার ভাইকে মারধর করা হলো। অথচ এত বড় ঘটনার পরও পুলিশ আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজখবর নেয়নি। এমনকি মামলা পর্যন্ত নেয়নি। অন্যদিকে আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা চরম আতঙ্কে আছি এবং ভয়ে বাইরে বের হতে পারছি না।
এদিকে মামলা না নেওয়া ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফইম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, তারা (ভুক্তভোগীর পরিবার) আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ দেননি। তারা কোর্টে গিয়েই মামলা করেছেন। এখনো নথিপত্র হাতে পাইনি। আদালত থেকে মামলার কপি আমাদের কাছে এলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদালতে করা অভিযোগে বলা হয়, ভিকটিম সুমন তার চাচা ট্যাক্সেস বারের সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিনিয়র অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিনের বাড়িতে থাকেন। তিনি আফতাবনগর, উত্তরা ও দক্ষিণখানসহ আশপাশের এলাকায় ইট, বালু, সিমেন্ট ও পাথর সরবরাহের ব্যবসা করেন এবং চাচার সম্পত্তি দেখভাল করেন। ঘটনার কিছুদিন আগে থেকে আসামিরা সুমনের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না দিলে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার দিন দুপুর দেড়টায় সুমন দক্ষিণখানের আব্বাসীয়া রোডে পৌঁছালে ওতপেতে থাকা অভিযুক্ত আসামিরাসহ অজ্ঞাত অন্তত ২৫ জন তাকে ঘিরে ফেলে। সেখানে ফের ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করলে সুমন অস্বীকৃতি জানান। পরে আসামি খোকন সুমনকে টেনেহিঁচড়ে সড়কে ফেলে দেন। পরে রড দিয়ে কপালে আঘাত করেন। এরপর আসামি সুলতান ধারালো চাপাতি দিয়ে বুকের বাম পাশে আঘাত করেন। একই সময়ে আসামি ফরহাদের এলোপাতাড়ি আঘাতে সুমন সংজ্ঞাহীন হয়ে যান। এ সময় আসামি মিরাজ সুমনের বুকের ওপর আঘাত করে পকেটে থাকা নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন। রক্তাক্ত সুমনকে বাঁচাতে তার সঙ্গে থাকা নারী স্বজনরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালান তারা। বেধড়ক মারধর করেন এবং পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করেন। একপর্যায়ে ‘সুমন মারা গেছে’ বলে হামলাকারীরা চলে যান। এ ঘটনায় মামলা করলে আত্মীয়স্বজনদের হত্যার হুমকি দেয় এসব সন্ত্রাসী।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত খোকন বলেন, ‘আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য একটি মহল এই মিথ্যা মামলা সাজিয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত দক্ষিণখানের জয়বাংলা সড়ককেন্দ্রিক আমার কাকার বাড়ির জমি ও রাস্তাসংক্রান্ত বিরোধ থেকে। রাস্তাটি প্রসারিত করার প্রক্রিয়ায় অন্যায়ভাবে জায়গা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে কাকা আদালতের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় সেনাবাহিনী এই জায়গা বাদ দিয়েই রাস্তার কাজ করছিল।’
তিনি বলেন, ‘কাকা বর্তমানে ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে রয়েছেন এবং বাড়িতে কেবল কাকি, চাচাতো ভাই ও বোনেরা অবস্থান করছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ৩টায় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে একাধিকবার সশস্ত্র ও মুখোশধারী দল কাকার বাড়িতে হামলা, কোপাকুপি ও ভাঙচুর চালায়। আওয়ামী লীগ কর্মী সুমনসহ (ভুক্তভোগী) তিন বোন মিলে যে প্রকাশ্যে ঢিল মেরে বাড়ি ভাঙচুর করেছে, তার স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে দুটি মামলা গ্রহণ করেছে পুলিশ। এসব মামলায় ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে তারা আদালতে আমার বিরুদ্ধে পালটা মিথ্যা মামলা করিয়েছে।’