Image description

দায়িত্ব গ্রহণের পর সাত মাস পার করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এরই মধ্যে বিএনপির অতিউৎসাহী কিছু নেতাকর্মীর বেপরোয়া আচরণে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তাদের চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যের অভিযোগে বিব্রত হচ্ছে সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে থাকলেও থামানো যাচ্ছে না। এরই সঙ্গে যোগ হয়েছে সুযোগসন্ধানী একটি মহলের ইন্ধন। তারা চলমান পরিস্থিতিকে আরও উস্কে দিচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে কঠোর সমালোচনার মুখে ফেলেছে। এমনই পরিস্থিতিতে ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকার হার্ডলাইনে। আবার দলীয় নেতাদের শৃঙ্খলায় আটকাতে কঠোর অবস্থানে বিএনপিও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানেই অপরাধ, সেখানেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে একেবারেই তৃণমূল পর্যন্ত যে কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেবে ক্ষমতাসীন দলটি। তারই অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছে গতকাল। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তরের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বহিষ্কার করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমাতে দেশব্যাপী কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নড়েচড়ে বসেছে সরকার ও প্রশাসন।

সম্প্রতি সারা দেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ভাঙচুর, লুটপাট, জবরদখলের চেষ্টা ও হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা সারা দেশের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বমহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এরপর আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর, রাজধানীর আদাবর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় দখল, চাঁদাবাজির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাম উঠে আসছে।

ফলে ঘটনাগুলো সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলেছে। এমনটিতেই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মধ্যে এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর পাশাপাশি দলীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীর কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। পাশাপাশি একটি সুযোগসন্ধানী মহল সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিকে আরও উস্কে দিচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপিও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় তার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুরসহ যে কোনো ধরনের অপকর্মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় পদ কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার। পাশাপাশি দলের ভেতরে চালানো হবে শুদ্ধি অভিযান। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক বলেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনিয়ম করে পার পাবে না—এই বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছাতে চায় বিএনপি। এবার শুধু সাংগঠনিক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অপরাধীদের সরাসরি আইনের মুখোমুখি করার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান থাকবে, কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলবাজি করতে আসে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিন, মামলা করুন। এক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হবে। দলের মূল বার্তা, দলের নামে অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিতে পারবেন না।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল ফেনীতে এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২৪-এর ৫ আগস্ট স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিদায় করেছে জনগণ। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি এই দেশের মানুষ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপিকে। এই দেশের দায়িত্ব বিএনপিকে যখন মানুষ দিয়েছে, বিএনপি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে যে আইন সবার জন্য সমান। দেশে যাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা দেখেছি, কীভাবে আইনের শাসনকে বিগত ১৭ বছর ভূলুণ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করে আমরা আইনের শাসন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসার বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদক নিরসনে প্রতিনিয়ত পরিচালিত হচ্ছে এবং তা ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে। তিনি আরও বলেন, কারও দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কেবল প্রত্যাহার নয়; বরং যথাযথ বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা এবং ক্রিমিনাল অফেন্স মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস; এই মাসে কোনো অপশক্তি দেশে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারবে না।’

গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশুকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে জায়গাটিও দখলে নেয় একটি মহল। এর সঙ্গে জড়িত হিসেবে সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম উঠে আসে। সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের। এ ঘটনায় গত বুধবার রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে মহানগরের উত্তরের কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ঢাকা মহানগর উত্তর-শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুভ্র, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আওতাধীন শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নূর আলম, থানা যুবদল নেতা সাজ্জাদুর রহমান মিশু, মো. সোহেল, কবির হোসেন, আকবর হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দারুস সালাম থানার আহ্বায়ক মো. আক্তার হোসেন মামুন, সদস্য সচিব মো. হাফিজুর রহমান এবং মহানগর পশ্চিম শাখার সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম, দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল দিপু, সদস্য সচিব ওমর নাঈম এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্য সচিব শান্ত রহমানকে দলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনাটির এখনো তদন্ত চলছে এবং এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্র জানায়, গত দুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন, এসব বিষয়ে তথ্য নেন। তদন্তে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে অন্যতম ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা মিষ্টির অন্যতম ঘনিষ্ঠ। পরে এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশমতো গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এমপি মিষ্টি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর আগে পাহাড়ে আন্দোলনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক দীপেন দেওয়ানও পদত্যাগ করেন। এর মধ্যে দিয়ে তৃণমূলকে নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা রক্ষার কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় নয়, এ মেসেজটা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, মহানগর উত্তরের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো দলের অভ্যন্তরের আলোচনা চলছে। গত বুধবার ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। ওই বৈঠকে মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন তারেক রহমান। এ ছাড়া এসব ঘটনায় দলের এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধনের বিষয়টিও বিএনপি চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আনেন কেউ কেউ। বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে তাদের নামেও নানা অভিযোগ জমা পড়েছে। তাদের এমপি ও দলীয় পদ এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া যেসব নেতাকর্মী দখল, চাঁদাবাজি কিংবা দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করছেন, তাদের তালিকা প্রস্তুত করার জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বিতর্কিত নেতাদের তালিকা ও তাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনা করছিলেন তৎকালীন কয়েকজন প্রভাবশালী যুবদল ও ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও গুন্ডামির অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বঙ্গভবনে তাদের ডেকে নিয়ে কথা বলেন। তখন তিনি তাদের হয় কারাগার, না হলে দেশের বাইরে চলে যেতে বলেছিলেন। এবারও ঠিক একইভাবে বাবার পথ অনুসরণ করে তারেক রহমানও ব্যবস্থা নিয়েছেন। গত বুধবার রাতেই মিষ্টিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে দেন তিনি।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে সদ্য পদত্যাগকারী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, এ বিষয়ে তদন্তের ভিত্তিতে চার্জশিট দেওয়া হবে এবং দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় সূত্র আরও জানায়, বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব নেতার বিরুদ্ধে বারবার চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা।

দপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত ৪ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘দলের ভেতরের কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা করছেন, সবাই নন। উচ্চাভিলাষী এসব নেতাকর্মীকে কঠোরহস্তে দমন করা হবে। কাউকে আমরা ছাড় দিচ্ছি না। প্রথম পর্যায়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরপর দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশৃঙ্খলা রোধে সরকারও তৎপর

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, আটক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। রাড্ডা সেন্টারে হামলার অবহেলার কারণে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর ঘটনায় মেজর (অব.) মুহিউদ্দিন চৌধুরী, মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ারসহ ৬ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রাজধানীর আদাবরে গত ২৫ সেপ্টেম্বর শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি আটতলা বাড়িতে চাপাতি হাতে হামলা চালানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর দুজন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

‘উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি গ্রেপ্তার’: কুমিল্লার দেবিদ্বারে মাদক সেবনের অভিযোগে উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি আব্দুল হাই কায়সারসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের একটি মুরগির খামারে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে উপজেলা প্রশাসন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে মাদক সেবনের দায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন। ঘটনার পরদিনই উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি আব্দুল হাই কায়সারকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করে যুবদল। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্বে) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির কোনো ধরনের অপকর্মের দায়দায়িত্ব দল নেবে না। একই সঙ্গে যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল ইসলামকেও ইয়াবাসহ আটক করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে উপজেলার উলাইল ইউনিয়নের দশচিড়া গ্রামের একটি পাকা সড়ক থেকে তাকে আটক করা হয়। নাজমুল ইসলাম ওই গ্রামের সবুর উদ্দিনের ছেলে।

এর আগে গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর শ্যামলীতে সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালের চিকিৎসক কামরুল ইসলামের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অন্যদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সরকারের নির্দেশে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করে পুলিশ। গত সাত দিনে জেলাজুড়ে একযোগে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে এক হাজার ৬৭২ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া কুমিল্লার পার্শ্ববর্তী জেলা চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক দিনে আটক করা হয় ৪৪৫ জনকে। এ ছাড়া নোয়াখালীতে ১৬৩ জন, লক্ষ্মীপুরে ১৮৪ ও ফেনীতে ১০৬ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, শুধু নেতাকর্মীদের নয়, একই সঙ্গে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও জনগণকে বিএনপি মেসেজ দিয়ে চাই, দলীয় পরিচয় কিংবা প্রভাব এখানে বড় নয়, সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। আগামী দিনেও কেউ দলের নাম ভাঙিয়ে অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না, তার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সসম্মানে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ তাকে বাসায় দিয়ে এসেছে। তার ভাষ্য, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—প্রভাবশালী হলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং বিশৃঙ্খলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

শুদ্ধি অভিযান চায় তৃণমূল

বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কিছু এমপি ও নেতাকর্মী দলকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করছেন। যতদিন ক্ষমতায় আছে, ততদিন নিজেদের অর্থবিত্ত বাড়াও। আবার তাদের তিন-চারটা পদপদবি দেওয়া হয়। কিন্তু যারা দলের যোগ্য, সৎ ব্যক্তি তারা কিন্তু কিছুই পান না। মহানগরের উত্তরের ঘটনায় শুধু একজন মিষ্টি এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এখানে আরও কয়েকজন জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দলের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি তুলেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ।

তাদের ভাষ্যমতে, যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্প্রতি ব্যক্তিস্বার্থে বিএনপির নাম ব্যবহার করতে চাওয়া ব্যক্তিদের এক করে দেখা উচিত নয়। এ ছাড়া দলের অনুপ্রবেশকারী ‘হাইব্রিড’ কিংবা ‘নব্য বিএনপি’ সদস্যদের ব্যাপারে দলকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ক্ষমতায় আসার পর দলের দুর্দিনের কর্মীরা পেছনে সরে যাচ্ছে। আর নব্য বিএনপির দলের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তার করছে।

বিএনপির এক নেতা বলেন, মৌসুমি পাখিরা দলে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। যারা বিগত সময়ে বিএনপির প্রকাশ্যে ক্ষতি করেছেন তারাও এখন বড় বড় পদে যাচ্ছেন, সুবিধা নিচ্ছেন। এগুলো বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সহযোগিতায় হচ্ছে। এগুলো দেখে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মর্মাহত।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বিদায়ী কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম রাজ্জাক কালবেলাকে বলেন, হঠাৎ করেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে। এটা দলের সিদ্ধান্ত। হয়তো নেতাকর্মীদের জন্য বেটার কিছু চিন্তা করছে হাইকমান্ড।