দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা ও ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ মোকাবেলায় মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় হচ্ছে বিএনপি। ষড়যন্ত্র করে দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ ঘোলাটে করতে বিরোধী দলগুলো মাঠে নামলে ছাড় দেবে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফিরবেন। এ সময়ে সারা দেশের নেতাকর্মীদের রাজপথের কর্মসূচিতে সরব থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির লং মার্চকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অপতৎপরতা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্ন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’র অভিযোগে বিএনপির হাইকমান্ড মাঠের রাজনীতি জোরদার করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গত রবি ও সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর সভাপতিত্বে যৌথ সভায় দলের যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।
সভায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার’ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানানো হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম দলের চলমান কর্মসূচি। এ জন্য মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রয়োজন আছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কর্মসূচির পরিধিও বাড়ানো হবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ওই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আমরা সকল ষড়যন্ত্র রুখে দেব। এক দফা কর্মসূচির মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে বিএনপি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তবে আওয়ামী লীগের মতো করে প্রতিহত করার কোনো কর্মসূচি দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো রাজপথে সক্রিয় থাকবে। মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিজ নিজ সংগঠনের উদ্যোগে পালন করবে। এর জন্য কেন্দ্র থেকে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে না।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যৌথ সভা করে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির কেউ যদি মানববন্ধন, মিছিল, কর্মশালা করে, করতে পারে। যার যার মতো করে তারা গণসংযোগ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত স্বৈরাচার এবং রাজাকারদের মেলবন্ধন অথবা তাদের পুরনো রাখিবন্ধনের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, সেটি আমাদের নজরে রাখতে হবে। সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বিএনপির এই কর্মসূচি নির্দিষ্ট সময়ের কোনো কর্মসূচি না, এটি অব্যাহত থাকবে।’
সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘বিরোধী দলের বর্তমান তৎপরতাকে দেশবিরোধী, গণতন্ত্র ও গণ-অভ্যুত্থান বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। যখন ট্রেনের বগিতে আগুন দেওয়া হয় তখন এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সেই জন্যই আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সতর্ক আছি।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সারা দেশে নেতাকর্মীদের জোরদার কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারা এই ষড়যন্ত্র করছে—এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে আমরা মিছিল, সমাবেশের পরিকল্পনা নিয়েছি। এটা আমাদের সার্বক্ষণিক চলমান প্রক্রিয়া। সাংগঠনিক কার্যক্রম সব সময়ই হয়। এটিকে আরেকটু জোরদার করতে বলছি।’
ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের যৌথ মিছিল শুক্রবার
ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার বিএনপির তিন সংগঠন (ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দল) ‘প্রতিবাদ মিছিল’ করবে। পাশাপাশি নিজ নিজ সংগঠনের ব্যানারে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করা হবে।
জানতে চাইলে যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলমান আছে। দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য জামায়াত-শিবির অপকর্ম করছে। আপনারা দেখেছেন, রাজশাহী রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণ্ডগোল হয়েছে। এর জন্য প্রতিবাদ হবে—ক্যাম্পাসে একটা মিছিল হতে পারত, বা এর জন্য শাস্তি দাবি করতে পারত। কিন্তু শিবিরের নেতৃত্বে রাজশাহী রেলস্টেশনে যেভাবে ভাঙচুর চালানো হলো, এটি দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটা আঁতাতের কথা শোনা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আজ সারা দেশে স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ মিছিল হবে। এ ছাড়া ২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের তিন সংগঠন ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।’
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী উগ্র সংগঠন ছাত্রলীগের যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সর্বদা প্রস্তুত আছে। তাদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে যেকোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে আছি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রাজপথ প্রকম্পিত এবং ছাত্রদলের দখলে থাকবে।’
প্রতিবাদ মিছিলে সোচ্চার বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো
সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় মূল দল বিএনপির পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মিছিল-মিটিং কর্মসূচি পালন করছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজপথের কর্মসূচিতে সোচ্চার অঙ্গদলগুলো। নিজ নিজ সংগঠনের ব্যানারে রাজধানীতে মিছিল-শোডাউন করছে নেতাকর্মীরা।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি গতকাল প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিবাদ মিছিল করেছে। ৯টি সাংগঠনিক টিম শিগগিরই সমাবেশ করবে। আজ সমাবেশের শিডিউল ঘোষণা করা হবে বলে জানান ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুর রহমান মিন্টু।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিও কর্মসূচি জোরদার করেছে। গতকাল উত্তরায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এতে অংশ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর, সদস্যসচিব মোস্তফা জামানসহ মহানগরের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল গত সোমবার মিছিল শোডাউন করেছে। যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নাশকতা ও জামায়াত-এনসিপি মাঠে নামার পাঁয়তারা করছে। সব মিলিয়ে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল বড় মিছিল কর্মসূচি পালন করেছে। এই কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে। আমাদের প্রতিটি ইউনিটকে এভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সারা দেশে যৌথ কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা
কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সারা দেশে বিএনপি ব্যানারে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে যৌথ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এই কর্মসূচি চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।
গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব বিল্লাল হোসেন বেপারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত দিনব্যাপী মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা আছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার মাওনাতে আমরা প্রতিবাদ মিছিল করেছি। এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’