বাড়তি দামে তেল কিনে মঙ্গলবার সকালে বরিশাল থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সুন্দরবন-১৬। পৌঁছার পর হিসাব মিলিয়ে দেখা যায় রাউন্ড ট্রিপে প্রায় ১১ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে মালিকের। একই অবস্থা দক্ষিণ উপকূলের মৎস্যনির্ভর অর্থনীতির। ডিজেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে নদী মোহনা ও সাগরে মাছ শিকারের খরচ। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে। তেলের দাম বাড়ায় সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। সর্বশেষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর বাতিল হতে শুরু করেছে হোটেল মোটেলের অগ্রিম বুকিং। সব মিলিয়ে তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বরিশাল তথা দক্ষিণের সার্বিক অর্থনীতিতে।
লঞ্চ ব্যবসার কফিনে শেষ পেড়েক : পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে চরম দুরবস্থা চলছিল বরিশালের নৌযোগাযোগ সেক্টরে। প্রায় বন্ধের পথে কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য হয়ে টিকে থাকা ঢাকা-বরিশালের লঞ্চ চলাচল। জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই রুট আর কোনোভাবেই টেকানো যাবে না বলে মনে করছেন লঞ্চ মালিকরা। বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট নিজামউদ্দিন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর আগে ১৮-২০টি লঞ্চ যাত্রী আনা-নেওয়া করত ঢাকা-বরিশাল রুটে। সেতু চালুর পর থেকেই ধস নামতে শুরু করে ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চ ব্যবসায়।
এই রুটের ৯টি লঞ্চ বিক্রি হয়ে গেছে। লোহার দরে সেগুলো কেটে বিক্রি করছেন মালিকরা। টিকে থাকা লঞ্চগুলোও চলছে কোনো মতো। মাসে বড়জোর ৫-৬টি ট্রিপ পাচ্ছে একেকটি লঞ্চ। বাকি সময়টা অলস থাকতে হচ্ছে ঘাটে।’ সুন্দরবন নেভিগেশনের পরিচালক আকতার হোসেন আকেজ বলেন, ‘ডিজেলের লিটার যখন ৮৪ টাকা তখন জ্বালানিসহ অন্যান্য মিলিয়ে রাউন্ড ট্রিপে আমাদের খরচ হতো আট লাখ টাকা। বর্তমান দামে সেই খরচ গিয়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১১ লাখে। এটা জানি যে, সরকার নতুন করে ভাড়া সমন্বয় করবে। কিন্তু তার পরও টিকে থাকতে পারব না।
বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেক শ্রেণির যাত্রীদের সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৪০৪ টাকা। আমরা ৩০০ টাকা করে নিয়েও যাত্রী পাচ্ছি না। সরকার হয়তো ভাড়া বাড়াবে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না। মঙ্গলবার থেকে ৪০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিকরা। এখন দেখি কী হয়।’ বরিশালের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর মালিকদের সংগঠন ‘বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শেখ আব্দুর রহিম বলেন, ‘৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি একটি লঞ্চ বরিশাল-ভোলা রুটে একবার রাউন্ড ট্রিপ দিলে আগে মালিকের ৩-৫ হাজার টাকা থাকত। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেই লাভ এখন ২-৩ হাজারে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় তো ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না।’
মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া : সাগরপারের উপজেলা কলাপাড়ার আলীপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম খান বলেন, ‘দুই নিয়মে সাগরে মাছ ধরতে যায় জেলেরা। কাকডাকা ভোরে গিয়ে মাছ ধরে রাতে ফিরে আসা আর সাগরে গিয়ে ৭-৮ দিন থেকে মাছ ধরা। ডিজেলের দাম বাড়ায় দুই খাতেই বেড়েছে খরচ। যারা ৭-৮ দিনের জন্য সাগরে যান তাদের বেড়েছে গড়ে ৫০ হাজার টাকা। ডেইলি ফিশিংয়ের ক্ষেত্রেও ৫-৬ হাজার টাকা বেড়েছে। এমনিতেই কয়েক বছর ধরে খুব একটা মাছ মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি পুরো মৎস্য সেক্টরকেই বিপদে ফেলবে। তেলের দাম বাড়ানোর কারণে যে খরচ বেড়েছে তার প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়বে।’
রহিম খানের এই কথার প্রতিফলন মেলে বাজারগুলোতে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের মাছের দাম। বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজারের ব্যবসায়ী সুলতান সিকদার বলেন, ‘এখানে নদী সাগরের মাছ আসে পটুয়াখালী-বরগুনা-ভোলা থেকে। এছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকে আসে বিভিন্ন প্রজাতির চাষের মাছ। ডিজেলের দাম বাড়ায় যেমন বেড়েছে মাছ ধরা ট্রলারগুলোর জ্বালানি ব্যয় তেমনি উত্তরবঙ্গ থেকে আসা পরিবহণেরও বেড়েছে খরচ। ফলে সবরকম মাছের দাম বেড়েছে।’ বরিশাল ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ী জহির সিকদার বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একদফা বেড়েছে ইলিশের দাম। যা শুনছি তাতে এই দাম আরও বাড়তে পারে। এর মানে সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে আরও দূরে চলে গেল ইলিশ।’
কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পে বিপর্যয় : সাগরপারের হোটেল ব্যবসায়ী মাসুম হায়দার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে যখন ডিজেলের দাম ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে এক লাফে ১০৫ টাকা হলো, তখন একবার ধাক্কা খেয়েছে পর্যটন শিল্প। তেলের দাম বাড়ায় কমে যায় যানবাহনের আনাগোনা। সেই থেকে যে সংকটের শুরু তা আজও কাটেনি। এর পরও দফায় দফায় কেবল বেড়েছে ডিজেলের দাম।’ প্রেসিডেন্ট পার্ক হোটেলের মালিক ফারুক মীর বলেন, ‘এখানে যারা বেড়াতে আসেন তাদের প্রায় সবাই দেশি পর্যটক। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাড়ে তাদের যাতায়াত খরচ। তাছাড়া মধ্যবিত্ত পর্যটকরা বেড়ানোর প্রশ্নে হিসাব কষে ঘর থেকে বের হন। যে পরিস্থিতি চলছে তাতে ব্যবসা কীভাবে টেকাব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
গ্র্যান্ড পার্ল হোটেলের মালিক একেএম আজাদ বলেন, ‘দিনে রাতে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। একটি রুমে গ্রাহক থাকলেও জেনারেটর চালাতে হয়। লাভের টাকা এমনিতেই চলে যাচ্ছিল জেনারেটরের জ্বালানিতে। এখন আবার বেড়েছে তেলের দাম। দাম বাড়ার পর অনেক পর্যটক অগ্রিম বুকিংও বাতিল করছেন।’ কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোতালেব শরীফ বলেন, ‘এখানে ৪শর বেশি হোটেল মোটেল রিসোর্ট রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত ৮-১০ হাজার পরিবারের রুটি রুজি। রয়েছে খাবার হোটেলসহ আরও নানা ব্যবসা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এর সবকিছুই এখন ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল লঞ্চ ব্যবসা, মৎস্য সেক্টর আর পর্যটন খাতেই নয়, সবক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আশার কথা হচ্ছে, সরকার বলেছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, যুদ্ধ থামলে, তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত হলে দাম আবার কমিয়ে দেওয়া হবে। এখন সেই আশায় বসে থাকা ছাড়া তো কোনো উপায় দেখছি না।’