বরাবরের মতো এবারও যথাযথ মান নিশ্চিত না করে সরকারি বই ছাপার মহোৎসব চলছে। নির্ধারিত মানের কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে বই ছাপছে একাধিক ছাপাখানা। কাগজের পুরুত্ব, উজ্জ্বলতা ও স্থায়িত্বে বড় ধরনের ঘাটতি পাচ্ছে তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে পাওয়ার পর বইগুলো দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বইয়ের মান তদারকির জন্য যে সংস্থাকে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশনের (পিডিআই) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাই জড়িত নিম্নমানের বই ছাপার এ পুরোনো চক্রে। মাধ্যমিকের বই পুরোপুরি ছাপা শুরু হওয়ার আগেই নিম্নমানের কাজ করে গাফিলতির জন্য অন্তত ১৪টি ছাপাখানাকে শোকজ করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে একাধিকবার।
একই সঙ্গে ৪৪টি প্রেসের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ফর্মা বই নষ্ট করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শেষের পথে এলেও মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি। তবে এনসিটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো যে সময় রয়েছে, তার মধ্যে সব বই ছাপা সম্ভব। আর বিভিন্ন প্রেস নিম্নমানের বই দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তা রুখতে এনসিটির পাশাপাশি মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, এবার প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ হাজার কপি, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬ কপি এবং মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২ কপি বই ছাপা হচ্ছে। এসব বই ছাপতে প্রি-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে ৫২টি ছাপাখানা ও মাধ্যমিকে প্রায় ১১৫টি ছাপাখানা কাজ করছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ছাপাখানাই মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ করছে।
নিম্নমানের বই ছাপার মহোৎসব: এনসিটিবির কর্মকর্তা ও তদারকিতে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বলেন, এখন প্রাথমিকের বই পুরোধমে ছাপার কাজ চলছে। তবে কিছু কিছু প্রেস মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ শুরু করেছে। মূলত প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শেষ হলেই মাধ্যমিকের ছাপার কাজ শুরু হয়। সবমিলিয়ে পুরোপুরি ছাপার কাজ শুরু হওয়ার আগেই হাতেগোনা কয়েকটি ছাপাখানা ছাড়া বাকি ছাপাখানার মালিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কোনো না কোনো ভাবে মান নিশ্চিত না করেই বই সরবরাহ করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে কাগজ ও কালির মান নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন। বাঁধাইয়ের অবস্থাও হচ্ছে নাজুক।
তদারকি সংস্থার কাজে নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যে প্রেসেই যাচ্ছি, সেখানেই কোনো না কোনো অনিয়ম পাচ্ছি। কোনো কোনো প্রেসকে একাধিকবার সতর্ক করলেও তারা তা আমলে নিচ্ছেন না। আমরা তো আর সারাদিন বসে থাকতে পারি না। আমরা থাকাকালে সতর্ক অবস্থায় কাজ করলেও সরে এলে মূলত অনিয়ম করে। সব তো আর চোখে চোখে রাখা যায় না।
তারা আরও বলেন, এবার সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হচ্ছে কাগজ ও কালিতে। ৮০ গ্রাম পুরুত্বের কাগজ দেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ছাপাখানায় দেওয়া হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ গ্রামের কাগজ। আবার কালিও ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের। যে ব্র্যান্ডের কালি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে তার অধিকাংশই নকল। বাঁধাই ঠিকমতো হচ্ছে না।
এক কর্মকর্তা বলেন, ভেতরে নিম্নমানের বই রেখে স্তূপের চারপাশ ভালো বই দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়। তখন সব বই সরিয়ে নিচের বইগুলো অনেক সময় দেখা সম্ভব হয় না। স্তূপের নিচের দিকে বই বের করলে দেখা যায় তাতে নানা অনিয়ম রয়েছে।
এদিকে বই ছাপাসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকায় এরই মধ্যে ১৪টি ছাপাখানাকে শোকজ করেছে এনসিটি। এর মধ্যে কোনো কোনো প্রেসকে দুবার শোকজ করা হয়েছে।
এনসিটিবির তথ্যমতে, প্রাথমিকের বই ছাপায় অনিয়মের জন্য আনন্দ প্রেসকে দুবার, সরকার প্রেসকে দুবার, রেদওয়ানীকে দুবার, লেটার অ্যান্ড কালারকে একবার, লিখন আর্ট প্রেস, সাগরিকা ও ফরায়েজি প্রেসকে একবার করে শোকজ করা হয়েছে। একইভাবে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য দোয়েলকে একবার, সাগরিকারে একবার, অ্যারিস্ট্রোক্রাটস সিকিউরিটি অ্যান্ড প্যাকেজিংকে একবার, লিখন আর্ট প্রেসকে একবার, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসকে দুবার, মেসার্স মুত্তাহিদা প্রিন্টার্স ও শৈলী প্রেসকে এবার শোকজ করা হয়েছে।
কেন শোকজ করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অননুমোদিত ও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার জন্য বেশি শোকজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছাপা ও বাঁধাইয়ে ঝামেলা রয়েছে। কেউ কেউ সময়মতো কাজ শুরু না করায়ও শোকজ করা হয়েছে।
এদিকে এবার পাঠ্যবই ছাপায় দরপত্র সমঝোতার শঙ্কা ছিল আগে থেকেই। এ নিয়ে দৈনিক কালবেলায় গত ৩০ জুন “পাঠ্যবই ছাপায় ‘দরপত্র সমঝোতার’ তৎপরতা” শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশ হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না করে সমঝোতার মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা করে নেন প্রেস মালিকরা। এর নেপথ্যে রয়েছে বড় প্রেস মালিকদের একটি সিন্ডিকেট। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মিলেমিশে কাজ করার তাগিদ দিচ্ছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সংশ্লিষ্ট শাখার কয়েকজন কর্মকর্তাও।
সূত্র জানায়, বই ছাপায় দরপত্র হয়েছে ৭০০টির বেশি। ৪৮৫টি দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৩১টিতে দরদাতা ছিলেন একজন করে। তিনিই কাজ পেয়েছেন। কোথাও আবার একই মালিকের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে অংশ নিয়েছে। আবার সব দরপত্রের দর প্রায় কাছাকাছি। প্রাক্কলিত দর ফাঁস করেই এই চক্র সুযোগটি নিয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই দরপত্র সমঝোতার কারণে সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
কয়েকজন প্রেস মালিক বলেন, তাদের সমঝোতা করে কাজ করার জন্য ডেকেছিল কয়েকটি প্রেস। কিন্তু তারা তা মানেনি। পরে তারা যে দাম ধরে টেন্ডার জমা দিয়েছিলেন, দেখা গেছে এর থেকে কয়েক পয়সা কম ধরে অন্যরা কাজ পেয়েছেন।
এবার ভাগবাটোয়ারায় টেন্ডার প্রক্রিয়া করতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অগ্রণী প্রিন্টার্স ও কর্ণফুলী আর্ট প্রেসের মালিক কাউছার উজ জামান রুবেল। কচুয়া প্রেসের হুমায়ুন কবির, কর্ণফুলী প্রিন্টার্সের মালিক হাসানুজ্জামান রবিন, বলাকা প্রেসের দুলাল সরকারসহ আরও কয়েকটি বড় প্রেস মালিক এ সমঝোতার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, কাউছার উজ জামান ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলে এ সেক্টরে সবচেয়ে প্রভাবশালী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে পানি জাহাঙ্গীরের আশীর্বাদে এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরু করেন তিনি। দিন দিন তিনি হয়ে উঠেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলেরও আশীর্বাদপুষ্ট। বিগত সরকারের আমলে এনসিটিবির বেশিরভাগ বই ছাপতেন তিনি। অবলীলায় সরবরাহ করতেন নিম্নমানের বই। এ নিয়ে বিগত সময়ে তাকে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা করা হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় ও হোমরাচোমরাদের হস্তক্ষেপে তিনি পার পেয়ে যেতেন। সেই রুবেল এখন ভোল পাল্টে বিএনপি সাজার চেষ্টা করছেন। ভাগিয়েছেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদও। বিভিন্ন বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে এখনো এনসিটিবিতে রয়েছে তার একছত্র আধিপত্য।
৪৪ প্রেসে সাড়ে ৪ লাখ ফর্মা নষ্ট, বই ও প্রচ্ছদ কাটা হয়েছে সরকারি বই ছাপার কাজে নিয়োজিত ৪৪টি ছাপাখানায় গত ৩৫ দিনে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৫টি ফর্মা, ১১ হাজার ৭৪৭টি বই এবং ৩১ হাজার ৭২০টি বইয়ের প্রচ্ছদ নষ্ট করা হয়েছে। ১৯ আগস্ট থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেসে নষ্ট করা ফর্মা, বই ও প্রচ্ছদের এ হিসাব উঠে এসেছে মনিটরিং কমিটির প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দোয়েল প্রিন্টার্সে সবচেয়ে বেশি ৬৭ হাজার ৭০০টি ফর্মা, ১ হাজার ২০০টি বই এবং ১ হাজারটি প্রচ্ছদ নষ্ট করা হয়েছে। এম/এস রেজা প্রিন্টার্সে নষ্ট করা হয়েছে ৪৫ হাজার ফর্মা। রেদোয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে ৪৪ হাজার ফর্মা এবং বর্ণমালা প্রেসে ২২ হাজার ফর্মা, ১ হাজার ৫০০ বই ও ৪ হাজার ৫০০টি প্রচ্ছদ নষ্ট করার তথ্য রয়েছে। একইভাবে ভয়েজার পাবলিকেশন্সে নষ্ট হয়েছে ২২ হাজার ফর্মা।
বড় পরিমাণ ফর্মা নষ্টের তালিকায় আরও রয়েছে শৈলী প্রিন্টার্স। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৭ হাজার ৪০০টি ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে। ন্যাশনাল প্রিন্টার্সে ১৬ হাজার, এফএএমএস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেসে ১৫ হাজার ৪০০, প্রাইম প্রিন্টার্সে ১২ হাজার এবং এম/এস আলিফ প্রিন্টিং প্রেসে ১০ হাজার ৩০০টি ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে। এম/এস আলিফ প্রিন্টিং প্রেসে এর পাশাপাশি ৫ হাজার বই ও ১ হাজার ২০০টি প্রচ্ছদও নষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া অগ্রণী প্রেসের ২ হাজার ফর্মা, অটো প্রিন্টিংয়ের ৪ হাজার ফর্মা নষ্ট করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল এমন অনেক প্রতিষ্ঠান এবারও কাজ পেয়েছে। আবার বারবার যারা অনিয়ম করছে তারা এবারও অনিয়ম করছে। তারপরও কেন তাদের রাখা হয়েছে তা রহস্যজনক।
এ প্রসঙ্গে অনিয়মে জড়িত কয়েকটি প্রেস মালিককে ফোন করলে তারা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেউ কেউ আবার ফোন রিসিভ করেননি।
অনিয়মে জড়িত পিডিআই প্রতিষ্ঠানও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) ও পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশনের (পিএলআই) জন্য দুটি করে প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়, তারাই জড়িত এই কারসাজির সঙ্গে। এবার পিডিআই তদারককারী প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি ও ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি। ইনফিনিটি প্রাথমিকের এবং ইনডিপেনডেন্ট মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির বই ছাপার মান যাচাইয়ের কাজ পেয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়মে জড়িত ইনডিপেনডেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি প্রেস মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিম্নমানের বইয়ের বৈধতা দিচ্ছে। অতীতেই এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি এনসিটিবি।
অভিযোগ উঠেছে, কয়েকটি বড় ছাপাখানার মালিক যোগসাজশ করে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডিকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে ছাপাখানাগুলো এ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে হাজার হাজার টন নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছে। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবের অধিকাংশ মেশিন নষ্ট। নেই স্থায়ী কোনো কেমিস্টও (কাগজ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ)।
কয়েকজন এনসিটিবির কর্মকর্তা বলেন, ইনডিপেনডেন্ট যেসব কাগজ ছাড় দিচ্ছে পরে গিয়ে দেখা গেছে সেসব কাগজেও পুরুত্ব ঠিক নেই। বাঁধাইয়েও ঝামেলা রয়েছে। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে আমরা কী করব। মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ প্রসঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসছে তা সঠিক নয়। আমি ঠিকমতো কাজ করছি।
প্রাথমিকের ছাপার কাজ চলছে পুরোদমে, মাধ্যমিকে শুরুই হয়নি
এনসিটির তথ্যমতে, প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ চলছে পুরোদমে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়ে গেছে। তবে মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ পুরোপুরি শুরুই হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত প্রথমে প্রাথমিকের কাজ করা হয়। যারা প্রাথমিকের কাজ পাননি তারাই মূলত মাধ্যমিকের কাজ শুরু করেছেন।
সর্বশেষ মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক পর্যন্ত ৮ কোটি ১৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৩৬ কোটি বইয়ের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ হয়েছে ৪৩ শতাংশ, বাঁধাই শেষ হয়েছে ৩৯ শতাংশ আর পিডিআই শেষ হয়েছে ২১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি বইয়ের মধ্যে ৮১ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধাই সম্পন্ন হয়েছে ৭৪ শতাংশ আর পিডিআই হয়েছে ৫৯ শতাংশ।
এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, প্রাথমিকের ছাপার কাজে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। কোনো কোনো প্রেস ইতোমধ্যে ছাপার কাজ শেষ করেছে। ৩১ অক্টোবের মধ্যে সব বই ছাপা, বাঁধাই ও পিডিআই শেষ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
অন্যদিকে, মাধ্যমিকের ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২ কপি বই ছাপা হচ্ছে। এসব বইয়ে মোট ফর্মাসংখ্যা ৪০৮ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার ১১০টি। এর মধ্যে ২৮ কোটি ২১ লাখ ৬২ হাজার ২৬৯ ফর্মা ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। যা মোট সংখ্যার ৬.৯১ শতাংশ। এর মধ্যে বাঁধাই শেষ হয়েছে ৪.৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ ১ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ৩২১টি। আর পিডিআই শেষ হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ৭ লাখ ১৯ হাজার ১৮০টি।
এর বাইরে আগামী বছর থেকে একবারে নতুন ৪টি বইয়ের ২৩টি লটের এখনো টেন্ডার হয়নি। পরবর্তী চুক্তি (নোহা) হয়নি আরও ৬৩ লটের। এসব বই যথাসময়ে পাওয়া নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। পুনরায় দরপত্র হয়েছে আরও ৩১টি লটের।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মো. খায়রুল ইসলাম খান বলেন, নভেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যে সব বই ছাপা ও বাঁধাই শেষ হয়ে যাবে। যেসব বই এখনো টেন্ডার পক্রিয়ায় আছে তাদের ছাপার সময় কম দেওয়া হবে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নেই।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান কালবেলাকে বলেন, সমঝোতা করে যারা বই নিয়েছে, তারা সময়মতো বই দিতে পারবে না। সর্বশেষ যে রিটেন্ডার হয়েছে সেখানে দেখা গেছে একটির বিপরীতে অনেকগুলো টেন্ডার জমা পড়েছে। দরও কম। কিন্তু আগে একটা টেন্ডারের বিপরীতে একটা টেন্ডার পড়েছে। সবগুলোর দরও ছিল কাছাকাছি। টেন্ডার সমঝোতা ঠেকাতে বোর্ডের কোনো উদ্যোগ ছিল না। আবার ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রেসগুলোর সঙ্গে আঁতাত রয়েছে। তাই ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করছে। যাতে কাজ বিলম্ব হয়। এতে বড় প্রেসগুলোর সুবিধা। সবার দেরি হলে তারা প্রশ্নের মুখে পড়বে না। আর যে বই নষ্টের কথা বলা হচ্ছে তা ‘জাস্ট আই ওয়াশ’। এর থেকে বেশি অনিয়মের খবর পাচ্ছি। তাই সরকারকে এখনো নজর দিতে হবে। না হলে যথাসময়ে মানসম্মত বই দিতে পারবে না। ফলে সরকারকে বিপদে পড়তে হবে।
সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, কেউ অনিয়ম করলেও জরিমানা করা হচ্ছে। এনসিটিবি এবার যথাসময়ে মানসম্পন্ন বই নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কেউ অনিয়ম করে ছাড় পাবেন না।
তিনি আরও জানান, পিডিআইর বাইরে এনসিটিবির ২৬টি মনিটিরিং টিম মাঠে রয়েছে। এ ছাড়াও এনসিটিবির সিনিয়র কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি, প্রাথমিক ও মাদ্রাসা অধিদপ্তরসহ গোয়েন্দা সংস্থাও মাঠে তদারকি করছে।