Image description

সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের দায় থেকে মুক্তি ও লোকসান সমন্বয় করতে সব মিলিয়ে মোট ৪৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ভর্তুকি চেয়ে আবেদন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এই অর্থের মধ্যে সরকারের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ভর্তুকিতে রূপান্তর অথবা পুরোপুরি অবলোপন (রিটেন অফ) করার আবেদন জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য ও স্থানীয় বাজারে বিক্রয় মূল্যের তফাতজনিত ঘাটতি মেটাতে সরকারের অর্থ বিভাগের কাছে এই আবেদন করেছে বিপিসি। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে জুলাই পর্যন্ত সর্বশেষ পাঁচ মাসে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে সংস্থাটির। এই অর্থও ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করার আবেদন করেছে বিপিসি।

সংস্থাটি বলছে, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর—এই প্রায় ১৪ বছরের সঞ্চিত ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণের দায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরছে তারা। ১৪ বছরের সঞ্চিত ঘাটতি মেটাতে নেওয়া এই ঋণের বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একাধিকবার অর্থ বিভাগকে চিঠি দিলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি সরকারের দেওয়া শর্ত মোতাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভ্যাট বাবদ পাওনা ২ হাজার কোটি টাকাও পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে বিপিসি যে সময়ের ঋণের কথা বলছে, সেই সময়ে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি মুনাফা করেছে সংস্থাটি। এই লভ্যাংশ দুই দফায় সরকারি কোষাগারে জামাও দিয়েছে বিপিসি।

ঋণের সূত্রপাত ও দীর্ঘ চিঠি চালাচালি: নথি অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের জুলাই থেকে বিপিসির লোকসান শুরু হয়। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত আমদানি ব্যয় ও বিক্রয় মূল্যের ফারাকে সংস্থাটির সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়ায় বিপুল অঙ্কে, যা সরকার ঋণ হিসেবে বিপিসিকে সমন্বয় করে দেয়— কিছু অংশ নগদ ভর্তুকি ও বন্ড আকারে এবং বাকিটা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ হিসেবে। বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের পর এই দায় দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকায়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রথম এ বিষয়ে অর্থ বিভাগকে চিঠি দেয় ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর। এরপর ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই অর্থ বিভাগ এনবিআরের ভ্যাট বকেয়া পরিশোধ-সাপেক্ষে বিষয়টি নিষ্পত্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়। এই শর্ত পূরণ করতে ২০১৮-১৯ সালে বিপিসিকে এনবিআরের কাছে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বকেয়া ভ্যাট পাঁচ কিস্তিতে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।

এ-সংক্রান্ত পৃথক নথিতে দেখা যায়, ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের প্রায় ২ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা এবং বিপিসি-নিয়ন্ত্রিত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান (যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা অয়েল ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক/অ্যাভিয়েশন) মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ভ্যাট বকেয়া পরিশোধের জন্য এনবিআরের চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এই ভ্যাট বকেয়া পরিশোধ শেষে বর্তমানে বিপিসির কাছে এনবিআরের আর কোনো বকেয়া নেই বলে নথিতে উল্লেখ আছে।

ভ্যাট বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার পরও মূল ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ফের অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়। ওই বছরের নভেম্বরে জ্বালানি বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভায় বিপিসির সব দেনা-পাওনা অবলোপনের সিদ্ধান্ত হয় এবং অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা কার্যকরের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালের অক্টোবরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১০টি সংস্থার ঋণ ও দায়-সংক্রান্ত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনেও কম মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রয়জনিত এই ঘাটতিকে ভর্তুকি হিসেবে বিবেচনা করার সুপারিশ আসে। সবশেষ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর বিপিসির উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়টি ফের অর্থ বিভাগে পাঠায়।

তৎকালীন বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের যুক্তি হিসেবে জানিয়েছিলেন, আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম দামে ভোক্তাপর্যায়ে তেল বিক্রি করা হয়েছিল বলে এটি প্রকৃতপক্ষে ভর্তুকিই। এজন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিপিসির ২৭৪ কোটি ২০ লাখ ডলার সমমূল্যের (প্রায় ২৭,৪২০ কোটি টাকা) বকেয়া ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধ জানিয়েছিল, যা মূলত আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রির কারণে সৃষ্ট সঞ্চিত লোকসানের দায়।

বিপিসির তিন প্রস্তাব: পুরোনো ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার দায় নিষ্পত্তিতে বিপিসি সাম্প্রতিক চিঠিতে অর্থ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথম প্রস্তাবে এই দায়কে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের সিদ্ধান্ত, জ্বালানি বিভাগের ২০২১ সালের নভেম্বরের সিদ্ধান্ত এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের ২০২২ সালের সুপারিশের আলোকে পুরোপুরি ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশ সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। এই অংশে বলা হয়েছে, বিপিসি ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশ বাবদ যথাক্রমে ১১ হাজার ৫০০ কোটি ও ৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ১৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। এই অঙ্ক ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা থেকে সমন্বয় করে অবশিষ্ট প্রায় ১০ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা জ্বালানি তেলের মূল্য কাঠামোয় প্রতি লিটারে ১ টাকা যুক্ত করে সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে আংশিক সমন্বয়ের কথা। 

এর আওতায় ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার মধ্যে সরাসরি ঋণ হিসেবে দেওয়া ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং লোকসান সমন্বয়ে দেওয়া ২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা পৃথক করে, শেষোক্ত অংশটি বিপিসির নিজস্ব উদ্বৃত্ত তহবিল অথবা মূল্য কাঠামোয় প্রতি লিটারে ২ টাকা যুক্ত করে সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিপিসি চূড়ান্তভাবে অনুরোধ জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য ও স্থানীয় বিক্রয় মূল্যের ফারাকজনিত লোকসান সমন্বয়ে সরকার কর্তৃক ভর্তুকির বিপরীতে প্রদত্ত ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার ঋণের দায় থেকে সংস্থাটিকে অব্যাহতি দিয়ে তা ডিএসএল বই থেকে অবলোপন করা হোক।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে নতুন চাপে বিপিসি: পুরোনো এই দায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক সংকট। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার স্থানীয় বাজারে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে দাম সমন্বয় করেনি। ফলে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে বিপিসিকে প্রায় ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অর্থ বিভাগকে দেওয়া চিঠিতে জানিয়েছে বিপিসি। এর মধ্যে মার্চে লোকসান ছিল ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি ২৬ লাখ, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

এই লোকসান সমন্বয়ে বিপিসি একাধিকবার সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে, সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগও ২ জুলাই, ২৮ জুলাই ও ১৩ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ে ভর্তুকির জন্য পত্র পাঠিয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে এখনো কোনো ভর্তুকি ছাড় হয়নি।

এর আগে মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসের লোকসান মেটাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকার বেশি ভর্তুকি চেয়েছিল।