Image description

সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন ও তৃণমূলের রাজনৈতিক কার্যক্রম চাঙা করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে দলটিকে নতুন করে সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, সারা দেশের থানা, ইউনিয়ন এবং  ওয়ার্ড পর্যায়ের সব মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

পাশাপাশি জেলা-উপজেলাসহ মহানগরীর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো গঠনের ব্যাপারে পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে। সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় দলীয় মন্ত্রী-এমপি ও নীতি-নির্ধারকেরা রাষ্ট্রীয় নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও, দলের সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা কাটাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসব্যাপী দেশজুড়ে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বা সাংগঠনিক মহাযজ্ঞ চলবে বলে দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের মতে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য- দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের আগে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং আগামী নির্বাচনগুলোতে জোট ও দলের দৃঢ় ঐক্য বজায় রাখা।  

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে দল গোছানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আবার দলের যদি সরকার হয়- সে সরকার সফলভাবে পরিচালনা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। প্রশ্ন হলো, অগ্রাধিকার কোনটা? কখন? এই মুহূর্তে যদি আপনি ভাবেন তাহলে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর মানুষ বঞ্চনার শিকার হয়েছে। অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তার আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। তারা দ্রুত এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়।

এমপ্লয়মেন্টের সুযোগ চায়, হালাল উপার্জনের সুযোগ চায়। এই কাজগুলো বিএনপি আগেও করেছে। তিনি আরও বলেন, তৃণমূলে আমাদের সমর্থকরা ঐক্যবদ্ধ। বিএনপির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যাপারে কারও দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু বিএনপি বা বিএনপির রাজনীতির ব্যাপারে তারা ঐক্যবদ্ধ। তাছাড়া সংগঠন তো যথেষ্ট শক্তিশালী। এটা আরও সুসংহত ও শক্তিশালী হবে যখন আমরা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ শেষ করতে পারব। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ এবং ডেলিগেট তালিকা সম্পন্ন হলেই দলের জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করা হবে।

জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে বর্তমানে ৭২টিরই মেয়াদ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে দলের ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল অন্যতম। সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত চলছে। দল ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠন-পুনর্গঠনের পাশাপাশি দলের শূন্য পদ পূরণেরও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে বিভিন্ন কমিটির শূন্য পদগুলোতে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্মমহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দলের কমিটি গঠন-পুনর্গঠনের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সুসংহত ও শক্তিশালী করার কাজ চলছে। কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ শেষ হলেই জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাতে দলীয় ঐক্য বজায় রেখে নিজেদের যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনা যায়- সে ব্যাপারেও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে জোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিএনপি। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় এই নির্বাচনগুলোতে তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং দলের শক্তি প্রদর্শন করতে বেশ কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তার মধ্যে রয়েছে- একক প্রার্থী নিশ্চিতকরণ : যেহেতু এই নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই একাধিক ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ ঠেকাতে এবং একক প্রার্থীর পক্ষে ঐক্য বজায় রাখতে দল কড়া নির্দেশনা জারি করেছে। জনপ্রিয়তার মূল্যায়ন : কমিটিতে এবং নির্বাচনে যাতে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি স্থান না পায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই যাতে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়- সে ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের নির্দেশনায় সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল গোছানোর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছে। 

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দল পুনর্গঠন এবং তৃণমূল গোছানোর কার্যক্রমে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি। প্রথম ধাপে জেলা ও উপজেলা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস করে সংগঠনকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহলের মতে, মাঠের নেতৃত্বের বড় একটি অংশ মন্ত্রী-এমপি হয়ে সরকারের দায়িত্বে রয়েছে। তাই তৃণমূলকে নতুন করে শক্তিশালী করা না হলে স্থানীয় ভোটের মাঠে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। ভোটের ফল যেন দলের পক্ষে থাকে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই দল গোছানোর এই উদ্যোগ বিএনপির।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত সম্প্রতি দল পুনর্গঠনের এই কাজ শুরু হয়েছে। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে এরই মধ্যে রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯ সদস্যবিশিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে এখনো তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। খুব শিগগিরই দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে বেশ কিছু নতুন মুখ আসতে পারে। পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি পদও শূন্য রয়েছে।

দলের প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের মাধ্যমে এসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ চলছে। এরপর প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের নতুন কমিটি আসবে। পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে তাদের দলে ফেরানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও দায়িত্বে রদবদল করা হবে। এভাবেই সাংগঠনিক কাঠামোয় নেতৃত্ব পরিবর্তন ও দায়িত্ব রদবদল হওয়ার পরই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করা হবে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকে আর কোনো কাউন্সিল হয়নি।

তৃণমূল গোছানোর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার সাংগঠনিক সফর ও তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতোমধ্যেই বিএনপি চেয়ারম্যান গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর ও জেলা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর বিভাগের জেলার নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করেছেন। পর্যায়ক্রমে সব বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এসব বৈঠকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করা ও তৃণমূলের কমিটি ঢেলে সাজিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাই ও দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। কমিটিতে বিতর্কিত বা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে-এমন কেউ যেন নেতৃত্বে আসতে না পারে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

সরকার থেকে দলকে আলাদা করতে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, তরুণ, মেধাবী ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের সামনে আনা। দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে মন্ত্রী ও এমপিদের জেলা, মহানগর বা উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে না রাখার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিকে সামনে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতাদের ভূমিকাকে মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে, যা দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে শেষ হবে। যেসব জেলা, উপজেলা ও থানায় কমিটি দেওয়া খুব জরুরি, সেগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত আকারে চলছে সাংগঠনিক কাজ, যা আগামী দিনে আরও বাড়ানো হবে।