ই-কমার্স ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায়িক সুবিধার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ফাঁকি দিচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, অনলাইন কল কিংবা নিজস্ব ওয়েবসাইটের আড়ালে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের বেচাকেনা হলেও তার বড় একটি অংশ থাকছে রাজস্ব খাতের বাইরে। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র তার প্রাপ্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সৃষ্টি হচ্ছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসারকে পুঁজি করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন কোম্পানি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (মূল্য সংযোজন কর) এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এর সাম্প্রতিক অভিযানে দুটি অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় পৌনে ৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
আলফা ই-শপ বিদেশি দামি ব্র্যান্ডের ফ্যান, ঝাড়বাতি, লাইটিং, এসি, টিভি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি ও স্থানীয়ভাবে বেচাকেনাসহ বাসাবাড়ির ইন্টেরিয়র নকশার কাজ করে। বনানী-১১ এবং মিরপুর-১২ এলাকায় দুটি শোরুমের পাশাপাশি ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (হোয়াটসঅ্যাপ, ওয়েবসাইট, করপোরেট সেল) ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিক্রি করলেও ভ্যাট দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। গত ৮ সেপ্টেম্বর এনবিআরের দল অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক পর্যালোচনাতেই প্রায় ২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করে। অভিযানে জব্দ করা দলিলাদি ও বিক্রয়সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট সেল, শোরুম সেল, বনানী অনলাইন সেল, অনলাইন কল সেল, হোয়াটসঅ্যাপ কল সেল, ওয়েবসাইট সেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে কিন্তু ভ্যাট দিচ্ছে না।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর মিরপুরে জে-ক্রিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা (পশ্চিম)-এর একটি দল অভিযান চালিয়ে সিপিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি জব্দ করে। অনলাইনভিত্তিক এই শপে তৈরি পোশাক ও বিলাসবহুল পাঞ্জাবি-শেরোয়ানি বিক্রি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে গোপনে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা জানা যায়।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে অধিকতর তদন্ত করছে এনবিআর কর্মকর্তারা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রতিষ্ঠান শোরুমে বিক্রির পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে-বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে জোরালো প্রচারণা চালিয়ে বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠী তৈরি করে। কিন্তু মূল বিক্রয়ের অংশ ভ্যাট চালান ইস্যু না করে কেনাবেচা সম্পন্ন করে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সুনির্দিষ্ট হিসাব না রাখার কারণে কেবল আলফা ই-শপ ও জে-ক্রিয়েশন-এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব।
এনবিআর থেকে জানানো হয়েছে, অনিয়মে অভিযুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংগৃহীত দলিলাদি অধিকতর যাচাইবাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা ও মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি রুখতে আগামীতে মাঠপর্যায়ে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের ঝটিকা অভিযান আরও জোরদার করা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানান, দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনো করজালের বাইরে রয়েছে। এদের করজালের আওতায় আনার পাশাপাশি সঠিকভাবে কর আদায়ে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।