ধরপাকড়, মামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হুঁশিয়ারি-কোনো কিছুতেই থামছে না কিশোর গ্যাং। বরং সময়ের সঙ্গে আরও বেপরোয়া ও হিংস্র হয়ে উঠছে তারা। অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার ও হামলার পাশাপাশি এখন নির্মীয়মাণ ভবনে কোটি টাকা চাঁদা দাবিও করছে গ্যাং সদস্যরা। প্রভাবশালী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের ছত্রছায়ায় এলাকা ভাগ করে চলছে তাদের আধিপত্য। গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে অনেকে। ফলে অভিযানের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই।
সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকায় একটি নির্মীয়মাণ ভবনে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে হামলা চালায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইমরানকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। এ ঘটনায় ছয়জন গ্রেপ্তার হলেও গ্যাংয়ের অন্য হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ এর মাত্র দুই দিন আগে মোহাম্মদপুরে এক মতবিনিময় সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকবে না।’
এরপর সোমবার রাতে পল্লবীর সবুজবাংলা এলাকায় এক গণমাধ্যমকর্মীর বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, পল্লবী, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, রমনা, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাংয়ের দাপট রয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন মহানগর ও জেলা শহরেও সক্রিয় এসব গ্রুপ। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৪০০ কিশোর গ্যাংয়ের ৪ হাজারের বেশি সদস্য সক্রিয়। এর মধ্যে ঢাকায় ১৫৯ ও চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি গ্যাং রয়েছে।
খুলনায় ৭, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ ও গাজীপুরে ১৩টি গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি নোয়াখালীতে, ২৫টি। ডিএমপির তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুরে ল ঠেলা গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, চেতালেই ভেজাল, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, চার্লি গ্রুপ, টক্কর ল গ্রুপ, ঘুটা দে, লারা দে, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ, মাহি গ্রুপ ও বেলচা মনির গ্রুপ অন্যতম। পল্লবীতে সক্রিয় আশিক গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা হারুনের ভাই ভাই গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপ।
উত্তরার দক্ষিণখানে বিগবস, ইয়ংস্টার গ্রুপ, ব্লাড বয়েজ, উত্তরা পূর্ব থানায় সসুজন গ্রুপ, রাজিব গ্রুপ, খোরশেদ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ৮টি গ্রুপের শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। তারা নিয়মিত চাপাতি, রামদা ও সামুরাই নিয়ে নিয়মিত মহড়া দিচ্ছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছেন, গ্যাংগুলোর বড় অংশই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় রয়েছে। অস্ত্রের মজুত, মাদক কারবার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সমাজমাধ্যমে অস্ত্রের মহড়া ও হামলার ভিডিও ছড়িয়ে নতুন সদস্য সংগ্রহ বা রিক্রুটমেন্ট করা হচ্ছে।
অভাব, হিরোইজমের আকাক্সক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ঘাটতি, অসুস্থ বিনোদন, অভিভাবকদের উদাসীনতা, অল্প বয়সে প্রযুক্তির ব্যবহার ও মাদকাসক্তিকে কিশোরদের গ্যাংয়ে জড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ‘শিশু গ্যাং’। ভাসমান ও বস্তির শিশুদের একাংশ বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, মামলায় আসামিদের নামের সঙ্গে ‘কিশোর গ্যাং’ উল্লেখ না থাকায় পরে তাদের অপরাধের ধরন শনাক্তের আলাদা সুযোগ থাকে না।
ফলে এখন পর্যন্ত কতজন কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাবও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন মহামারির পর্যায়ে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উপসর্গভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’ প্রভাবশালীদের একটি অংশ অর্থনৈতিক স্বার্থে এ সংস্কৃতি জিইয়ে রাখছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর মতে, ‘১৮ বছরের নিচের আসামিদের বিরুদ্ধে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ফলে মামলার ফাঁকফোকর দিয়ে পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তায় অনেকে বেরিয়ে আসে। এসব মামলা আলাদা কাঠামোর আওতায় এনে প্রয়োজনে পৃথক ট্রাইব্যুনাল করতে হবে। পাশাপাশি অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানো এবং গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’