Image description

পার্বত্যাঞ্চলে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কেটে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। এতে শত শত পাহাড় উধাও হয়েছে। সিন্ডিকেট করে এ নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে কক্সবাজার ও বান্দরবানে। সরকারি অভিযানও এ তৎপরতা ঠেকাতে পারছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের লাগোয়া এবং সীতাকুণ্ড উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা জঙ্গল সলিমপুর তিন      দশক আগেও মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে ঘেরা ছিল। পুরো এলাকা ছিল বন্যপ্রাণী ও পশুপাখির অভয়ারণ্য। সময়ের পরিক্রমায় পাল্টে গেছে সেই বাস্তবতা। পাহাড়খেকোদের কবলে পড়ে কয়েক দশকে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে অসংখ্য পাহাড়। হাজার হাজার একর জমির পাহাড় কেটে বসতি গড়েছে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ দশকে চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলার ৭০ শতাংশ পাহাড় উধাও হয়েছে।

আরও ২০ শতাংশ পাহাড় আঘাতপ্রাপ্ত। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কাটা রোধে সরকারি সংস্থাগুলো অভিযান চালালেও তা কোনো কাজেই আসছে না। পরিবেশবিদ ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক সময় জমির দাম কম ছিল, পাহাড়ের তেমন মূল্য ছিল না। কিন্তু এখন পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি ও অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কারণ একবার একটি পাহাড় কেটে ফেলতে পারলেই তা আর আগের অবস্থায় ফেরানো যায় না। কেউ পাহাড় কেটে ১ কোটি টাকার ভূমি তৈরি করার অপরাধে যদি ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে পার পায় তাহলে পাহাড় কাটবেই।’ 

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে।’ ২০২২ সালে পাহাড় কাটার ওপর যৌথ গবেষণা করে চট্টগ্রামের ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে দাবি করা হয়-চট্টগ্রাম মহানগরীতে চার দশকে ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে। ৪০ বছর আগে পাহাড় ছিল ২০০টি, যার ৬০ শতাংশ এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। পাঁচ দশক আগে চট্টগ্রামে বড় ও মাঝারি মানের চার শতাধিক পাহাড়ের অস্তিত্ব ছিল। পাহাড়খেকোদের আগ্রাসনে নগরের ৭০ শতাংশ পাহাড় বিলীন হয়েছে। নগরীর বাইরে বিলীন হয়েছে ৪০ শতাংশ পাহাড়। এ ছাড়া আরও ২০ শতাংশ পাহাড় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে আবাসন তৈরির নামে পাহাড়ের ওপর এসেছে সবচেয়ে বড় আঘাত। নগরীর খুলশী, বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি, জেলার হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী, আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ধ্বংসের অন্যতম কারণ বসতি স্থাপন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতেই ১২০টির মতো ছোট-বড় পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন এবং বিভিন্ন স্থাপনা। নগরীর লালখান বাজার এলাকার বাটালী হিলের পাদদেশ কেটে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ‘মতিঝর্ণা’ এলাকা গড়ে উঠেছে।

লালখান বাজারের পোড়া কলোনি এবং হাই লেভেল রোড সংলগ্ন পাহাড়গুলো কেটে অবৈধ বস্তি ও কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। আকবর শাহ ও পাহাড়তলী এলাকার বেলতলী ঘোনা, বিশ্ব কলোনি এবং এ কে খান পাহাড় কেটে ব্যাপক বসতি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে রেলওয়ের মালিকানাধীন বেশ কিছু পাহাড়ও অবৈধ দখলে নিয়ে কেটে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। আরেফিননগর, ছিন্নমূল বস্তি এবং মুক্তিযোদ্ধা কলোনি পুরোটাই বায়েজিদ এলাকার পাহাড়গুলো কেটে তৈরি করা হয়েছে। এখানে পাহাড় কেটে রীতিমতো প্লট আকারে বিক্রি করা হয়। খুলশী এলাকায় নাগিন পাহাড় ও রূপসী পাহাড়সহ বেশ কয়েকটি পাহাড় কেটে আবাসিক প্লট ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। 

নগরীর আমিন জুট মিল সংলগ্ন পাহাড়গুলো কেটে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কাঁচা ঘরবাড়ি তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ফয়’স লেক সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা এবং জিয়ানগর পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা ও বসতি গড়ে উঠেছে। জানা গেছে, সংঘবদ্ধ অপরাধী সিন্ডিকেট সরকারি পাহাড় দখল করে সেখানে ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য অবৈধ বস্তি গড়ে তোলে। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় একইভাবে পাহাড় কেটে বিশাল সাম্রাজ্য ও অবৈধ ভাড়ার ব্যবসা তৈরি করা হয়েছে। 

এখানে ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ৩১ হাজার পরিবারের বসতি। হাটহাজারী উপজেলার সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আমতলী ও বরইতলী এলাকার অসংখ্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ‘সন্দ্বীপ কলোনি’ নামে একটি আবাসিক এলাকা। হাজার হাজার একর পাহাড় কেটে ওই এলাকায় বসবাস করছে কয়েক হাজার পরিবার। একই উপজেলার মির্জাপুর ও ফরহাদাবাদ ইউনিয়ন এলাকায় পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে বসতি। আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার সীমান্তবর্তী ঐতিহাসিক দেয়াং পাহাড় কেটে ব্যাপক হারে শিল্পকারখানা এবং এর আশেপাশে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে। একই উপজেলার বৈরাগ ও বড়উঠান এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করায় বন্যহাতির আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। 

মীরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের কয়লা পশ্চিম সোনাই এবং আশেপাশের বনাঞ্চলের পাহাড়ি টিলা কেটে নতুন করে অবৈধ বসতি ও প্লট তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর, পাইন্দং, বাগানবাজার এবং হারুয়ালছড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য খামারবাড়ি, ইটভাটা ও বসতি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক ইটভাটা। ইট তৈরির কাঁচামাল জোগান দেওয়া হচ্ছে পাহাড় কেটে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ি টিলাগুলো এক্সকেভেটর দিয়ে কেটে সমতল করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এভাবে তিন উপজেলায় পাহাড়ের ঢালে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ে উঠেছে।

পরিবেশবিদ ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়ার মতে, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে শাস্তি ও জরিমানা আরও কঠোর করা উচিত। প্রয়োজনে জমির মৌজা রেটের সঙ্গে সমন্বয় করে জরিমানা আদায় করা উচিত। দীর্ঘ সময় কারাদণ্ড দেওয়া উচিত। তাহলে পাহাড়খেকোরা আগ্রহ হারাবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে চট্টগ্রাম ও দেশের ঘনবসতি এলাকার পাহাড়গুলোর জরিপ করা উচিত। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়মিত সেগুলো মনিটরিং করা উচিত। নাহলে পাহাড় রক্ষা করা যাবে না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, ‘পরিবেশ আইন এখন আর যুগোপযোগী নয়। যেসব সাজার বিধান আছে সেগুলোও পুরোপুরি প্রয়োগ হয় না।’

কারা কাটছেন পাহাড় : পাহাড় কাটায় জড়িতদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সময় পাহাড় কাটার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। যখন যে রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনা করে সেই দলের স্থানীয় নেতাদের আশীর্বাদে স্থানীয় পাহাড়খেকোরা পাহাড় কাটেন। এর বাইরেও স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাহাড় কাটায় জড়িত।

কক্সবাজার : পাহাড়, সমুদ্র ও নদী নিয়েই কক্সবাজারের সৌন্দর্য। কিন্তু কয়েক দশকে কক্সবাজার শহরসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়। প্রশাসনের অভিযান দায়সারা। কিছুতেই থামছে না পাহাড় কাটা। হুমকিতে পড়ছে কক্সবাজারে সৌন্দর্য, পরিবেশ আর বর্ষা মৌসুমে বাড়ে ভূমিধসের আশঙ্কা। পাহাড় ধসে মারা যায় মানুষ। কক্সবাজার শহরের প্রবেশপথে বাসটার্মিনালের পশ্চিম পাশে ইসলামাবাদ, শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল বশরে পাহাড়, পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারের ঘোনা, খাজা মঞ্জিল কিংবা লারপাড়া এলাকায় দিন-রাত শ্রমিক দিয়ে পাহাড় সাবাড় করছে প্রভাবশালীরা। ভারী বৃষ্টি হলেই কোদাল ও শাবল দিয়ে পাহাড়ের মাটিগুলো আলগা করে দেওয়া হয়। এতে বিশাল বিশাল পাহাড় ফাটল ধরে ধসে পড়ে। প্রভাবশালীরা শ্রমিক নিয়োগ করে এসব পাহাড় কেটে ঘরহীন মানুষকে টাকার বিনিময়ে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। আবার কিছু দরিদ্র মানুষ পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ে বসবাস করে।

দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্ব পুঁজি করে ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট পাহাড় কাটার মতো অপরাধে জড়িত থাকায় সহজে তা বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। কক্সবাজারের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ১২ হাজার ৬০৫ একর বনভূমি ব্যক্তিপর্যায়ে দখল হয়েছে। যেখানে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। অন্যদিকে দক্ষিণ বন বিভাগের প্রায় ১৫ হাজার একর বনভূমিতে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এসব পাহাড়ে প্রতিনিয়ত নির্বিচারে কোপ বসায় রোহিঙ্গারা। পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে ১০-১২টি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের দিয়ে পাহাড় কাটছে। 

পাহাড় কাটার মাটি বৃষ্টির পানিতে ভেসে শহরের নালা-ড্রেন ভরাট হচ্ছে, আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো শহর ডুবে যায়। বান্দরবান : পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটছে সদর উপজেলার সুয়ালক এবং লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফাইতং ইউনিয়নে ৩১টিরও বেশি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকার পাহাড় কেটে মাটি আনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফাইতং এলাকার বাসিন্দা আবদুল হক জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে লামা উপজেলার ফাইতং এলাকায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। 

সামান্য বৃষ্টিতেই এখানে সেখানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। এলাকার ইটভাটার মালিকরা এতই প্রভাবশালী যে, গত বছর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি টিম ফাইতং এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে ইটভাটার শ্রমিক ও মাস্তানরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এ অবস্থায় অভিযান বাদ দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ফিরে আসে। বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এস এম মনজুরুল হক জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। বান্দরবানের মানবাধিকার কর্মী এম রুহুল আমিন বলেন, কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে টিকে থাকা পাহাড়গুলো রক্ষা করা সম্ভব।