ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পাঁচ ধাপে চায় সরকারি দল বিএনপি। সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণের কথা না বললেও চলতি বছরের শেষ দিকে প্রথম ধাপ শুরু করে তা আগামী বছরের মার্চে শেষ করার পক্ষে দলটি।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে এটাই নিয়ম। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পাদন করার জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে অনেক বিষয় আছে। তাই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশনের সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া ভালো। তিনি বলেন, ‘আশা করি, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো দূরত্বের সৃষ্টি হবে না।’
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিল। এ ঘোষণার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে পরদিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমে জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা না করেই ইসি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না। প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকার ও ইসির মতদ্বৈততা প্রকাশ পেয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি কখন কীভাবে নির্বাচন চায়।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, পাঁচ ধাপে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে বিএনপি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে পাঁচ ধাপে নির্বাচনের বিষয়ে মতামত দেন অধিকাংশ সদস্য। এতে দলের হাইকমান্ডও একমত। দলটির পরিকল্পনা, চলতি বছরের শেষদিকে নির্বাচন শুরু করে আগামী বছর মার্চের মধ্যে সব ধাপের ভোট গ্রহণ শেষ করা।
বিএনপির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু ভোটের সময়সূচির বিষয় নয়। এটি দলের তৃণমূল সংগঠন ও প্রার্থী ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন-স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক আগ্রহী প্রার্থী থাকলে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনি শৃঙ্খলা বজায় রাখা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা, প্রার্থী বাছাই এবং নির্বাচনি জোট বা সমঝোতার বিষয়ও সামনে আসবে। এ কারণে বিএনপির পাঁচ ধাপের প্রস্তাবের সঙ্গে শুধু ভোট দ্রুত শেষ করার বিষয়টি নয়, দলীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতির প্রশ্নও যুক্ত রয়েছে।
দলীয় নেতারা মনে করেন, নির্বাচনের জন্য সঠিক সময় না পেলে দলের ভিতরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাঁচ ধাপে নির্বাচন হলে দল প্রতিটি ধাপের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে যোগ্য ও সৎ প্রার্থী বাছাই করার পর্যাপ্ত সময় পাবে। বিএনপি মনে করে, বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলো ভেঙে পড়েছিল এবং বর্তমানে অনেক জায়গায় প্রশাসকদের মাধ্যমে কাজ চলছে। পাঁচ ধাপে ধীরে ধীরে নির্বাচন সম্পন্ন করলে মাঠপর্যায়ে একটি স্বাভাবিক ও সর্বজনগ্রাহ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।
বিএনপি মনে করে, পাঁচ ধাপে নির্বাচন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি রাখা এবং নির্বাচনকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখা সহজ হবে। এতে সরকারের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ফুটে উঠবে। প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের ফলাফল ও মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী ধাপগুলোতে কৌশল নির্ধারণ করা সহজ হবে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন। ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর তিন দিনে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা জানিয়েছে কমিশন। সেখানে স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দলগুলোর মতামত নেওয়া হবে। বিএনপির পাঁচ ধাপের প্রস্তাব সরাসরি ইসির আলোচনার টেবিলে তুলে ধরবে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বলেন, সংবিধানের নিয়মকানুন মেনে, সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিরাই নির্বাচিত হবেন।