Image description

বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান। যিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের একসময়ের ‘দুর্ধর্ষ’ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। তাকে ডাকা হয় বড় সাজ্জাদ নামে। সম্প্রতি তার দুই অনুসারী পুলিশের কাছে দিয়েছে বেশ কিছু তথ্য। যেখানে বড় সাজ্জাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উঠে এসেছে তিন সংসদ সদস্য ও এক প্রভাবশালী নেতার নাম। এই নেতাদের সঙ্গে সাজ্জাদ ও তার শীর্ষ অনুসারীদের ‘পর্দার আড়ালে’ যোগাযোগের তথ্য এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমও নিশ্চিত করলেন, বড় সাজ্জাদের বাহিনীর রাজনৈতিক কোনো ‘ব্যাকআপ’ আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘ডেভিড ইমন ও মোবারককে তাদের পলিটিক্যাল শেল্টারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। লোকাল কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা নেতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে কি না। তারা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি। তবে পলাতক রায়হানের সঙ্গে একজন সংসদ সদস্যের একটি ছবি ফেসবুকে আছে। সেটিও আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি। পরিচয় দেয় আর কী! এর বেশি কিছু না। মোবারক তো একসময় আওয়ামী লীগ করত। ফটিকছড়ির তৈয়ব বাহিনীর হয়ে কাজ করত।’

সাজ্জাদ বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারের ভারী অস্ত্রশস্ত্রগুলো উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এবং নগরীর বিভিন্ন গোপন আস্তানায় মজুদ রাখা হয় বলেও জানালেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত দুই বছরে চট্টগ্রামের এসব উপজেলা ও নগরী মিলিয়ে অন্তত ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে বাকলিয়ার জোড়া খুন এবং বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহকে গুলি করে আহত ও তার সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাকে হত্যাসহ ২৬টি ঘটনায় সাজ্জাদ বাহিনীর সম্পৃক্ততা পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে বড় সাজ্জাদ এবং জড়িত হিসেবে রায়হান, ডেভিড ইমন, মোবারক, বোরহান, দিদার, হেলালসহ কয়েকজনের নাম এসেছে।

নগর-পুলিশের এক কর্মকর্তা বলছিলেন, সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিতে চাপের মুখে পড়েন তৎকালীন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে সাজ্জাদ বাহিনীর কর্মকাণ্ড ও তাদের নেপথ্যের রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দেন। বালুমহালের দখল-বেদখল ও এলাকাভিত্তিক বিএনপি নেতাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সাজ্জাদ বাহিনীর সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের তথ্য এসেছিল সেই প্রতিবেদনে। তবে সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হওয়ায় বিষয়টি তখন চাপা পড়ে যায়।

বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাসিব আজিজ। কথা হলো তার সঙ্গেও। তিনি বললেন, ‘প্রতিবেদন বড় বিষয় নয়। ডাবল মার্ডারের পর আমি বাকলিয়ার বালুমহাল বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আসলাম চৌধুরী সাহেব অনেক অনুরোধ করেছিলেন। আমি বালু উত্তোলন করতে দিইনি। এরশাদ উল্লাহ সাহেবকে গুলি করা হয়েছিল। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। নির্বাচন একেবারে সামনে ছিল। না হলে যেসব হোয়াইট কলার পলিটিশিয়ান ভালো মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ান আর আড়ালে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেন, তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে আসতাম।’

আসলাম চৌধুরী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। দলটির মনোনয়ন পেয়ে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও নগরীর একাংশ) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে খেলাপি ঋণ জটিলতায় উচ্চ আদালতের রায়ে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়েছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নগরীর বাকলিয়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ঘনিষ্ঠজন হিসেবে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাকে বালুমহালের ব্যবসা দেখভালের কাজে লাগিয়েছিলেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আসলাম চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘বালুমহাল আমি লিজ নিইনি। আমার পরিচিত কিছু লোক আগের চেয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি ভাড়ায় সেগুলো ইজারা নিয়েছিলেন। তাদের জন্য আমি সিএমপি কমিশনারকে বলেছিলাম।’
সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘জেলখানায় তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তাকে নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে আমি ভালো করে তুলেছিলাম। সে আমার ভক্ত হয়ে ওঠে। জেল থেকে বেরিয়ে আমার ছবি দিয়ে পোস্টারও ছাপায়। বালুমহাল যারা লিজ নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে সরোয়ার বাবলারও সম্পর্ক ছিল। তাকে বালুমহালের ব্যবসার জন্য খুন করা হয়েছে বলে আমি মনে করি না। এর পেছনে পলিটিক্যাল কারণ আছে। আমার সঙ্গে সে থাকুক এটা হয়তো অনেকে চাননি। আবার সে ভালো হয়ে গেছে এটা তার দলের সন্ত্রাসীরা সহ্য করতে পারেনি। পলিটিক্যালি কেউ হয়তো তাকে ঝামেলা মনে করত।’

নিহত সরোয়ার বাবলার পরিবারও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাকে প্রকাশ্য হত্যার ঘটনায় দুজন সংসদ সদস্যকে দায়ী করে আসছেন তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের মধ্যে একজন সংসদ সদস্য ছাত্রজীবনে চট্টগ্রামের একটি স্কুলে সাজ্জাদের সহপাঠী ছিলেন।

সরোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রশ্ন শুনে সামনাসামনি ছাড়া এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না বলে জানান। গতকাল বুধবার সকালে দেখা করতে চাইলে তিনি জানান যে চট্টগ্রামে থাকবেন না। যদিও এদিন দুপুর ১২টার দিকে এরশাদ উল্লাহকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিআইজি প্রিজনের কার্যালয়ের সামনে দেখা গেছে।

সরোয়ার বাবলা হত্যার পর পুলিশ জানিয়েছিল, মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তাকে গুলি করেছিল সন্ত্রাসী রায়হান আলম। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানো একটি ছবি রায়হান ফেসবুকে ‘কাভার ফটো’ হিসেবে রেখেছেন। বিষয়টি পুলিশেরও নজরে এসেছে।

গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘কেউ দেখা করতে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে যদি ছবি একটা তোলে, আমি কী করতে পারি! আমি তাকে চিনি না। কোনোদিন তার চেহারাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। চৌদ্দগোষ্ঠীর কাউকে আমি চিনি না। বাড়ি কোথায়, কার ছেলে, কার নাতি কিছুই জানি না। এরপরও ফেসবুকের একটা ছবির কারণে যে কোনো ঘটনার পর বারবার আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি এর কী জাস্টিফিকেশন দিতে পারি বলেন? পুলিশকে বলেছি, আমার মোবাইলও ট্র্যাক হয়। তার (রায়হান) মোবাইলও ট্র্যাক হয়। কোনোদিন একবারের জন্য, এক মিনিট, এক সেকেন্ডের জন্য তার সঙ্গে আমার কথা বলার বা যোগাযোগের কোনো তথ্য কি আপনারা পেয়েছেন? যদি পেয়ে থাকেন, আমাকে জানান। তখন আমি জবাব দেব।’

সাজ্জাদ বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ডেভিড ইমন ও মোবারককে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মোবারক রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ডেভিড ইমন ও মোবারক দুজনেই পুলিশকে জানিয়েছেন, একজন সংসদ সদস্যের নির্দেশে রায়হান যুবদল নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা সাজান। রায়হানের নির্দেশে তারা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

মাসুদুল হক চৌধুরীর বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘টাকার বিনিময়ে রায়হানকে ভাড়া করে আমার ভাইকে খুন করা হয়েছে। কে ভাড়া করেছেন, সেটি রায়হানকে গ্রেপ্তার করলে জানা যাবে। প্রভাবশালী কারও নাম এলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করেছে। রাঙ্গুনিয়ার এমপি হুম্মাম কাদের চৌধুরী যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন।’

এসপি মাসুদ আলম বললেন, ‘রায়হানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সাজ্জাদকে কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যায় দেখছি। সে নাম পাল্টে ফেলেছে। তার আগের পাসপোর্টও নেই। আমরা সব তথ্য সংগ্রহ করছি।’

নগর-পুলিশের কর্মকর্তারা জানালেন, ভারতে থাকা সাজ্জাদ ২০১১ সালে নিজের নাম পাল্টে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামে নতুন পাসপোর্ট করেন। এতে বাবা-মায়েরও নাম পাল্টে হাজি শুক্কুর ও হাজি জাহানারা বেগম উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা লেখা হয় বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সাহাজিরা গ্রাম।