কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে চলছে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে থাকা জমি এবং অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ডজনখানেক স্থাপনা রক্ষায় সড়কের অ্যালাইনমেন্ট বা গতিপথ পরিবর্তন করে সৈকতের দিকে নেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও কেন প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টের হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্ট পর্যন্ত সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। সড়কটির প্রস্থ হবে ২৮ মিটার। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর।
সরেজমিন দেখা যায়, সমুদ্রতীরসংলগ্ন বালিয়াড়ি ভরাট করে প্রায় এক কিলোমিটার অংশে সড়কের মাটির কাজ এগিয়েছে। কোথাও বালু ফেলে জায়গা উঁচু করা হয়েছে, আবার কোথাও খননযন্ত্র দিয়ে বালুর স্তূপ সমান করা হচ্ছে। এতে সাগরলতা উপড়ে গেছে এবং কোথাও বালুর নিচে চাপা পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন আগেও এলাকায় ১০ থেকে ১২টি বড় বালুর টিবি বা ডেইল ছিল। সেগুলোর অনেকটাই কেটে সমান করা হয়েছে। বালিয়াড়ি উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে রক্ষায় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসাবে কাজ করে। একই সঙ্গে সাগরলতা, লাল কাঁকড়া ও বিভিন্ন উপকূলীয় প্রাণীর আবাসস্থল হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য : সড়ক নির্মাণের পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, ইসিএভুক্ত সমুদ্রসৈকতে বড় ধরনের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত বর্তমান নির্মাণাধীন সড়কের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। যে ছাড়পত্রের কথা বলা হচ্ছে, সেটি ৯ ফুট প্রশস্ত একটি পুরোনো রাস্তা সংস্কারের জন্য দেওয়া হয়েছিল। ওই রাস্তার সঙ্গে বর্তমানে নির্মাণাধীন সড়কের কোনো মিল নেই। জমির উদ্দিন জানান, সড়ক নির্মাণের তথ্যপ্রমাণ ও কাগজপত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে উপস্থাপন করতে প্রকল্প পরিচালক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনে খননযন্ত্র দিয়ে বালু সমতল করে সড়ক নির্মাণের কাজ দেখতে পাওয়া যায়। পরে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, সরকারি অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথিসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. শাহীন মিয়া বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। টেন্ডারের আগেই পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, পূর্বনির্ধারিত রোড অ্যালাইনমেন্ট বা নকশা অনুযায়ীই কাজ হচ্ছে।
অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন ও প্রভাবশালী নেতাদের স্থাপনা রক্ষার অভিযোগের বিষয়ে শাহীন মিয়া বলেন, এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। তারা পৌরসভার দেওয়া কাজ ঠিকাদার হিসাবে বাস্তবায়ন করছেন।
ব্যক্তিস্বার্থে অ্যালাইনমেন্ট বদলের অভিযোগ : এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সড়কের নির্ধারিত জায়গার আশপাশে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জমি ও স্থাপনা থাকায় অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করা হয়েছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের দখলে থাকা জমি এবং অবৈধ স্থাপনা রক্ষায় সড়কটি সৈকতের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, আমরা সড়ক চাই। কক্সবাজারকে সাজাতে উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে সেটা হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত। তিনি অভিযোগ করেন, আগের পরিকল্পনা ও অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করে সাগরের দিকে সড়ক নেওয়া হয়েছে। দখলদারদের স্বার্থরক্ষায় এমনটি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে বিএনপির এক নেতার মালিকানাধীন প্যাসিফিক রেস্টুরেন্টকে ঘিরে। রেস্টুরেন্টটি পরিচালনা করেন জেলা যুবদল নেতা জাবেদ ইকবাল। অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, রেস্টুরেন্টটি সড়কের জায়গায় পড়েনি। বরং সৈকতে তাদের আরও ৩০ ফুট জায়গা রয়েছে।
কাজ বন্ধের দাবিতে আইনি নোটিশ : সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মাণাধীন সড়কের কাজ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাপা। অন্যদিকে প্রকল্প বন্ধের দাবিতে দুই সচিবসহ আট সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। নোটিশে ইসিএ ও ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোনে’ নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়।
পৌরসভার দাবি, শহর রক্ষায় প্রকল্প : কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া বলেন, পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা করেই শহর রক্ষা বাঁধ ও সড়ক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত এবং জরিপ, নকশা ও গবেষণার পরই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, পরিবেশসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, প্রথম ধাপে সুগন্ধা থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে সায়মন থেকে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত আরও প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বর্তমান নির্মাণাধীন সড়কের জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট কোথায় ছিল, সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে কি না এবং বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণের অনুমোদন কে দিয়েছে?