ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর অক্টোবর থেকে পিছিয়ে এখন নভেম্বর ধরে এ নির্বাচন শুরু করার নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগের মতোই ধাপে ধাপে হবে এই নির্বাচন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এতদিন বলে এসেছে—অক্টোবর থেকেই এই নির্বাচন শুরু করতে চায়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে কথা হলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালবেলাকে বলেন, আমরা সবসময়ই বলে আসছি নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাস—এগুলো হলো নির্বাচনের জন্য আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সহায়ক মাস। এ মাসগুলোর মধ্যে এপ্রিল ধরা যেতে পারে। এখন এর মধ্যে দুর্গাপূজা আছে কি না, রমজান আছে কি না, পরীক্ষা-বার্ষিক পরীক্ষা আছে কি না, যদি থাকে, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করছি। আমরা আগে অক্টোবর ধরে পরিকল্পনা করে এসেছি। এখনো আমরা সব পরিকল্পনা অক্টোবরের মধ্যে শেষ করব। কিন্তু ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা আমাদের এখন নভেম্বরে। যেদিন ভোট গ্রহণ হবে, তার ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করা হবে।
ইসি এতদিন বলেছে, অক্টোবরের শুরুতে ভোট এবং আগস্টের শেষার্ধে তপশিল ঘোষণা হতে পারে। এখন নভেম্বর কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখন অক্টোবর ধরে কাজ করছি।
ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে নির্বাচন শুরু হবে জানিয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, এর সঙ্গে পৌরসভা হয়তো হতেও পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই নির্বাচন কমিশনার আরও জানান, আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো স্থানীয় নির্বাচনের আচরণবিধি এসে পড়েছে। তবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালাটি ও আইন সংস্কারের জন্য ইসির সুপারিশ এখনো পাঠানো হয়নি। ‘আমাদের হাতে বিদ্যমান যেসব আইন-বিধি থাকবে সেগুলো ধরেই আমরা আগাব’, বলেন তিনি।
এর আগে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোন কোন প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী, তার তথ্য চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল কমিশন। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার তালিকা ইসিতে পৌঁছেছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচ ধরনের (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি গতকাল ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বলেন, এসব নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে আগামী সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করা হবে। ওই বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের তপশিল ও ভোটের তারিখ নির্বাচন কমিশনই নির্ধারণ করবে। ইসির সঙ্গে আলোচনার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্রিফ করা হবে।
সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সেরে রাখছে কমিশন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও খোঁজ নিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আইজিপি, বিজিবি মহাপরিচালক এবং আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে গত সোমবার সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ইসির প্রস্তুতির পাশাপাশি সরকারের অন্য সংস্থা, বাহিনীর প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কোন নির্বাচন কবে হবে দিণক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। বিদ্যমান আবহাওয়া, বর্ষাকাল, বন্যা, পূজা, পাবলিক পরীক্ষা, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র থাকবে—যথাসম্ভব সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণ করা হবে। দিনক্ষণ এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন খুব বেশি দেরি হবে না। আমাদের কিছু আইন-কানুন, বিধি-বিধান সংশোধন করছি। আইনি বাধ্যবাধকতা মাথায় রেখে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
সিইসি বলেন, সরকার নয়, ভোটের তারিখ আমরা ঠিক করব। তবে বিজিবি, এসআরবি—সবাই সরকারের লোক। শুধু ইসির একার প্রস্তুতি নয়; এসব বাহিনী যারা নির্বাচনে কাজ করবে, তাদের প্রস্তুতিরও দরকার আছে। স্থানীয় নির্বাচনে একটু সহিংসতা বেশি হয়। আশা করি সবাইকে নিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। সেটি কমিশনের মাথায় আছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই সদিচ্ছা কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন একটি অনন্য নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সহিংসতা চায় না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা বেশি থাকায় এ বিষয়ে কমিশন বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আইন-বিধি ছাড়া স্থানীয় সরকারের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা আছে। মাঠপর্যায়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোটকেন্দ্রের সম্ভাব্য চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর ভোটের ২৫ দিন আগে প্রতি স্তরের চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করা হবে। আর এখন পর্যন্ত এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই তারিখ কিছুটা পরিবর্তন হলেও হতে পারে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৩ সিটি করপোরেশন, ৪ হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২৬টি পৌরসভা, ৫০০ উপজেলা, তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে।