নিয়ম নেই। সুপারিশ নেই। তবু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় নাম! আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর। নিয়মিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন। পিএসসির সুপারিশও নেই। অথচ মিলেছে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠতার সুবিধা। আবার কারও চাকরির ধারাবাহিকতাও নেই। আছে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন। কেউ আবার এক শাখার প্রকৌশলী হয়েও পেয়েছেন অন্য শাখার পদ। এসব অনিয়ম উঠে এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে। মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামতেও রয়েছে আপত্তি। তারপরও সেই ২৫৭ জনকে রেখেই তৈরি হয়েছে জ্যেষ্ঠতার তালিকা। যুগান্তরের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আগেই মত দিয়েছিল, এসব প্রকৌশলীর চাকরি নিয়মিতকরণ যথাযথ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা উচিত। কিন্তু সেই মতামত উপেক্ষা করেই ২১ এপ্রিল খসড়া তালিকা প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আপত্তি জানানোর জন্য দেওয়া হয় ৩০ কর্মদিবস। এর মাত্র চার দিনের মাথায় ২৬ এপ্রিল খসড়া তালিকা চূড়ান্ত ও হালনাগাদের জন্য ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে আহ্বায়ক এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে সমন্বয়ক করা হয়। কমিটি শুনানি করেছে। ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সভাও করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাছাই কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে বলেন, শুনানি করা ছাড়াও সব বিধিবিধান মেনে বিষয়টি সুরাহ করা হচ্ছে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় সব পক্ষের মতামত নিয়েছে। মন্ত্রণালয় কনভিন্স। তিনি মনে করেন, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি কোনো অন্যায় করা হচ্ছে না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৮ সালে এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৮ বছর পর নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিতকরণ না হওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জ্যেষ্ঠতার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নিয়ম মেনে চাকরি করা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে রাজস্ব খাতে পদায়ন করা হয়। এসব স্থানান্তরের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ‘পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই তাদের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।’
নিয়মিতকরণ ছাড়াই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২১২ জন : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, নিয়মিতকৃত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে গণনা করতে হবে। পিএসসির আওতাভুক্ত পদে আত্তীকরণের ক্ষেত্রেও কমিশনের সুপারিশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, রাজস্ব খাতে এখনো নিয়মিতকরণ হয়নি-এমন ২১২ জনকেও জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিয়মিতকরণের আগে তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এছাড়া রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের আগের চাকরির ধারাবাহিকতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জনপ্রশাসনের মতে, অনিয়মিত ২৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্পের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না। অথচ তাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় রাখা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির চোখে গুরুতর অনিয়ম : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণের আদেশ জারি প্রয়োজন। নিয়মিতকরণ যথাযথ না হওয়ায় তাদের জ্যেষ্ঠতা গণনারও সুযোগ নেই। এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না বলেও মত দিয়েছে কমিটি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন : খসড়া তালিকায় থাকা প্রকৌশলীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি। তালিকার ৩৭৬ ও ৪৭১ নম্বর সিরিয়ালের দুই সহকারী প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগদানের সময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেননি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করে ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এছাড়া ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৭ ও ৩৫১ নম্বর সিরিয়ালের ৫ জনের এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদেরও পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলীরাও পুরকৌশলী : নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলসহ ভিন্ন শাখার পাঁচ প্রকৌশলীকে পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট প্রকৌশল শিক্ষাগত যোগ্যতার ব্যত্যয় ঘটিয়েও নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির পথ তৈরি করা হয়েছে, তদন্ত নথিতে এমন অভিযোগ রয়েছে।
পিএসসির সুপারিশের বাধ্যবাধকতা : জ্যেষ্ঠতার জটিলতা নিরসনে স্থানীয় সরকার বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ মতামত দেয়। এতে বলা হয়, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদটি নবম গ্রেডের হওয়ায় নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১০, ২০১১ ও ২০১৩ সালে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা সমীচীন। এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই মতামত ও নির্দেশনা উপেক্ষা করেই চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ২৫৭ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পিএসসির মতামতও নেয়নি : রাজস্ব খাতে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণে পিএসসির সুপারিশ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা জানতে চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন নিয়মিত হিসাবে চাকরিরত প্রকৌশলীরা। জবাবে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট জানান, এসব প্রকৌশলীর রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির অভিমত গ্রহণ করা হয়নি।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই ১৮০ জনকে চলতি দায়িত্ব : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিতকরণ না হলে চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। নিয়মিতকরণের সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার প্রশ্ন জড়িত থাকায় ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা গণনার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় অনিয়মিত ১৮০ জনকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন ওঠায় এখন তড়িঘড়ি করে রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণ না হওয়া ২৫৭ জনকে ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের অংশ হিসাবে পিএসসি সচিবালয়ের মতামত বা সুপারিশ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণ হলেও ওই তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ নেই। কারণ, ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণ বিষয়ে জারিকৃত স্পষ্টীকরণ পত্র অনুযায়ী এভাবে জায়েজ করার সুযোগ নেই।
প্রশ্নের মুখে জ্যেষ্ঠতার তালিকা : সব মিলিয়ে ২৫৭ প্রকৌশলীর রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, নিয়মিতকরণ, পিএসসির সুপারিশ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদোন্নতিসহ প্রতিটি ধাপেই প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনের তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামত এসব প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যাদের রাজস্ব খাতে চাকরি নিয়মিতকরণই যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি, তাদের কীভাবে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় স্থান দেওয়া হলো?
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত প্রকৌশলীদের পক্ষে সদ্য নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েছেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘সবকিছু বিবেচনা করেই সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্ত মানার আহ্বান জানাচ্ছি।’
অপরদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পক্ষে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, ‘ধাপে ধাপে কীভাবে একটি বৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি ঢালপালা মেলছে, তা জনপ্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনই বড় প্রমাণ। মন্ত্রণালয় যদি এসব বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়, রেকর্ডপত্র কিন্তু থেকেই যাবে। একদিন এই অনিয়মের দায় কেউ এড়াতে পারবেন না।’