Image description
তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে সেপ্টেম্বরেই বাড়ে সংক্রমণ-মৃত্যু

বর্ষা মৌসুমের শেষদিকে থেমে থেমে হচ্ছে বৃষ্টিপাত। এতে বাড়ছে এডিস মশার সংক্রমণ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর রোগী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। গত তিন বছরের ডেঙ্গু সংক্রমণের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের চিত্র এবং চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণে এসব আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্টের পর সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর চাপ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এবার আগস্ট শেষ হওয়ার আগেই প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল দেশে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮ জনে। শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩০ জন। আগস্টের এখনো কয়েকদিন বাকি। এ ২৫ দিনেই বছরের অর্ধেক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে এসেছে। এ সময় মারা গেছে বছরের সর্বোচ্চ ৩৪ জন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি বছরগুলোয় ডেঙ্গু সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। এ সময়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ সাধারণত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং জমে থাকা পানি। এসবের ওপর এডিস মশার প্রজনন নির্ভর করে। থেমে থেমে বৃষ্টি হলে এই প্রজনন আরও বাড়তে পারে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে বা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার কাজ নয়। সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আগস্টের শেষদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেপ্টেম্বর নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সাধারণত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং জমে থাকা পানির ওপর এডিস মশার প্রজনন অনেকটা নির্ভর করে। এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে বা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মানুষকে সম্পৃক্ত করে সামাজিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্টের পর ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর চাপ বেড়ে যেতে পারে। কোথায় মশা বাড়ছে এবং কোথায় রোগী বাড়ছে, সেটি নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। ডেঙ্গু এখন ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তাই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেও বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে প্রজননস্থল ধ্বংসে মানুষকে যুক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নয়; সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সামনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

 

সেপ্টেম্বরেই কেন বাড়ে শঙ্কা ডেঙ্গুর মৌসুমি চরিত্র বাংলাদেশে বদলে যাচ্ছে। একসময় জুলাই-আগস্টে সংক্রমণের শীর্ষ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগস্ট-সেপ্টেম্বর এবং কখনো অক্টোবর পর্যন্ত রোগটির প্রকোপ স্থায়ী হচ্ছে। গবেষণায়ও বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পিক সিজন আগস্ট থেকে অক্টোবরের দিকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ওই বছর আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৩৪২ জন। অথচ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ওই এক মাসে রোগটি শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন এবং মারা যান ৩৯৬ জন।

তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়েছিল প্রায় ১১ শতাংশ। আর মৃত্যু বেড়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরই ছিল ওই বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। বছর শেষে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৫ জনে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৬৬৯ জন, মৃত্যু হয় ১২ জনের। আগস্টে রোগী বেড়ে হয় ৬ হাজার ৫২১, মৃত্যু ২৭। কিন্তু সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণ এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৭ জনে, আর মৃত্যু হয় ৮০ জনের। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়েছিল প্রায় ১৭৭ শতাংশ। মৃত্যু বেড়েছিল প্রায় ১৯৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের ৮০ মৃত্যু ছিল আগস্টের প্রায় তিনগুণ।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ১০ হাজার ৮৩৯টি আক্রান্তের ঘটনা ও ৫৮টি মৃত্যু রেকর্ড হয়। চট্টগ্রামেও ৯০৭ রোগী ও ১১টি মৃত্যু হয়েছিল। গত বছরেও আগস্ট-সেপ্টেম্বরের ব্যবধান ছিল উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মৃত্যু হয় ৩৯ জনের। সেপ্টেম্বরে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৯০০ জনে, আর মৃত্যু হয় ৭৬ জনের। অর্থাৎ ২০২৫ সালেও আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মৃত্যু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেপ্টেম্বরেই ওই বছরের সর্বোচ্চ মাসিক মৃত্যু রেকর্ড হয়। এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩০ জন এবং মারা গেছে ৮৮ জন। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল ২৯ হাজার ৪৪ জন; এবার একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩০। অর্থাৎ রোগী বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৮৬ জন। গতকাল এক দিনেই ৯০৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এই রোগীর সংখ্যা উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। এর আগের দিন ২৪ আগস্ট ৯৯৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। চলতি বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগীর রেকর্ড। ধারণা করা হচ্ছে, আগস্টের শেষ সপ্তাহের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ সেপ্টেম্বরের হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের কারণ গতিপথ, আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, এডিস মশার ঘনত্ব, নগর ব্যবস্থাপনা, রোগীর দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

হিসাবটি সহজ। আগস্টের ২৫ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। এই গতি সেপ্টেম্বরে অপরিবর্তিত থাকলে মাসে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক হবে না। কিন্তু ২০২৪ সালে আগস্টের ২৭ মৃত্যু থেকে সেপ্টেম্বরের মৃত্যু বেড়ে হয়েছিল ৮০—প্রায় তিনগুণ। ২০২৫ সালে ৩৯ থেকে বেড়ে ৭৬—প্রায় দ্বিগুণ। আর ২০২৩ সালে আগস্টের ৩৪২ মৃত্যু থেকে সেপ্টেম্বরেই তা বেড়ে হয়েছিল ৩৯৬।

ডেঙ্গু সংক্রমণ এখন শুধু ঢাকায় নয় ডেঙ্গু ভয়াবহতার পরিবর্তিত চিত্র হলো ভৌগোলিক বিস্তার। ২০২৩ সালেই দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গুর বিস্তার দেখা গিয়েছিল। চলতি মাসের গত ২৪ আগস্ট এক দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে—২১৫ জন। বরিশালে ১১৭, চট্টগ্রামে ১০৭, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১২৬, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ১৫৮ এবং ঢাকা উত্তর সিটিতে ৯৭ জন ভর্তি হন। আগামী মাসে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে সারা দেশে পরিস্থিতির চরম অবনতি হতে পারে।