বরিশালের বাবুগঞ্জ সদরে ৩০ শতাংশ জমির ওপর আধুনিক সাজসজ্জায় দোতলা বাড়িটি জলিল মোল্লাদের তিন ভাইয়ের, তা এলাকার সবাই জানেন। বরিশাল সদরে আইচা গ্রামে সাবেক এমপি নাসিম বিশ্বাসের মাছের ঘেরের পাশে ১০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ঘেরটির মালিকও জলিল মোল্লা। এ ঘেরে পাঁচটি পুকুর, অর্ধশতাধিক বিদেশি গরু-ছাগল আর হাজার হাজার হাঁস-মুরগি রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, বাবুগঞ্জের রহমতপুর ইউনিয়নের খানপুরা মৌজায় এ জলিল মোল্লা কিনেছেন ৫০ লাখ টাকামূল্যের ২০ শতাংশ জমি। তিনি দুই সহযোগীর কাছে কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন, যারা ওই টাকায় ঠিকাদারি করেন।
জলিল মোল্লা এত সম্পদের মালিক হলেন কীভাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এলাকাবাসীর অনেকেই জানান, অন্তত ১৮ বছর আগে এ জলিল মোল্লা মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে ছিলেন কয়েক বছর, সেখানে গাড়ি চালাতেন। তবে দেশে ফেরার পর এত বছর ধরে তার পেশা কী, তা জানেন না কেউ। অবশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ ফিসফিস করে কিছু বলার চেষ্টা করলেও অজানা আতঙ্কে গলা ঝেড়ে কেউ কিছু বলতে চাইলেন না। শুধু স্থানীয়রা জানালেন, জলিল মোল্লার পরিবার প্রভাবশালী, তার এক ভাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ জলিল মোল্লার সম্পদের পাহাড় নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) অবশ্য খোলাসা করেছে। ডিবির ভাষ্য, বরিশালের জলিল মোল্লা দেশে ডাকাত দলগুলোর ‘বস’। দেশের যেখানেই বড় বড় ডাকাতি-ছিনতাই হয়, সেখান থেকেই ভাগ পান তিনি। দেশজুড়েই তার রয়েছে ডাকাতির নেটওয়ার্ক, রীতিমতো তিনি ডাকাতি-ছিনতাইর মাস্টারমাইন্ড। মূলত ডাকাতির টাকায় জলিল মোল্লা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, গত ৯ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় ফিলিং স্টেশনের সোয়া কোটি টাকা ছিনতাইয়ের মাস্টারমাইন্ড এ জলিল মোল্লা। ওই টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পান তিনি।
ওই ছিনতাইয়ে জড়িত আটজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মাস্টারমাইন্ড জলিল মোল্লাও রয়েছেন।
কে এই জলিল মোল্লা? স্থানীয় লোকজন বলছেন, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের খানপুরা গ্রামের বাসিন্দা এ জলিল মোল্লা। তার বাবা গনজের আলী মোল্লা কৃষিকাজ করতেন। দুই সংসারে গনজের আলীর আট ছেলে। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের পাঁচজনের মধ্যে সবার ছোট ছেলের নাম জলিল মোল্লা।
প্রতিবেশীরা বলছেন, জীবনের শুরুতে জলিল মোল্লাও গ্রামের সাধারণ কৃষক ছিলেন। ২০০২ সালে ঢাকায় এসে ভাড়ায়চালিত ট্যাক্সি চালাতেন। এতেও জীবনের গতি ফেরাতে না পেরে ভাগ্য বদলের আশায় পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সেখানেও দীর্ঘদিন গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। পাঁচ বছর পর দেশে ফেরেন। এরপর তার পেশা সম্পর্কে আর কারো ধারণা ছিল না। তবে একের পর এক জমি কেনা ও মাছের ঘের তৈরি নিয়ে লোকজনের মধ্যে একটা সন্দেহ ছিল সব সময়ে।
গাড়িচালক থেকে ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড হয়ে অঢেল সম্পত্তির মালিক:
ডিবি পুলিশ বলছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার প্রতিষ্ঠানের টাকা ছিনতাই থেকে শুরু করে ঢাকার আশপাশে ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড এই জলিল মোল্লা। নিজে খুব একটা মাঠে না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে টার্গেট ঠিক করাসহ টাকা ছিনতাইয়ের সব আয়োজন তিনিই করেন। অস্ত্র ভাড়া করা থেকে শুরু করে চলাচলের গাড়ি ভাড়া ও গ্রুপের সদস্য সংগ্রহের কাজও তার। কোনো ডাকাতি-ছিনতাই সফল হলে জলিলের পকেটেই যায় লুটের অর্ধেকটা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরিশালের কাউনিয়া থানার শায়েস্তাবাদ এলাকায় প্রধান সড়কের পাশে প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ওপর পাঁচতলা ভিত্তির চার ইউনিটের ভবনটির দোতলা নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় নির্মিত ভবনটির মালিকানা জলিল মোল্লা ছাড়াও তার অন্য দুই ভাই দলিল মোল্লা ও খলিল মোল্লার।
রাজধানীতে ফিলিং স্টেশনের সোয়া কোটি টাকা ছিনতাইয়ে সম্পৃক্ততা পেয়ে ডিবি পুলিশের একটি দল জলিল মোল্লার গ্রামের বাড়ি গিয়ে তদন্ত করে। ডিবির ওই দলের সূত্র বলছে, জলিল মোল্লার বাড়ির প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিখুঁত। বাড়ির প্রতিটি কোণে কোণে স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরা। ভবনে লাগিয়েছেন নিরাপত্তাবিশিষ্ট বিদেশি কোম্পানির দরজা, যা আধুনিক মেশিন দিয়ে কাটা ছাড়া খোলার উপায় নেই। যদিও বর্তমানে বাড়িটির নিচতলা একটি বেসরকারি এনজিও এবং একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া রয়েছে।
তার খামার ও ঘের দেখভালের জন্য রয়েছে একাধিক কর্মচারী। যাদের তিনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে বেতন দেন। খামারের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট রাতে জলিল সর্বশেষ তার খামারে এসেছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে আবার চলে যান। ঘেরের ভেতর তার থাকার জন্য আলাদা একটি ঘর আছে, সেখানেও রয়েছে ঘুমানোর বিশেষ ব্যবস্থা।
জলিলের এক স্বজন কালবেলার কাছে দাবি করেন, ২০১৯ সালে দেড় একর জমি কেনেন জলিল। পরে মেহেন্দিগঞ্জের একটি জমিদার পরিবারের ওয়াকফ স্টেটের জমি আকবর নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে লিজ নেন। এর পাশেই আরও প্রায় ৩০ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। সব মিলিয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলায় জলিলের অন্তত চার কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে।
ডিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জলিল মূলত তার ভাই ও স্বজনদের নামে সম্পদ কেনেন। আগের এই কৃষক পরিবারটির বরিশাল ও বাবুগঞ্জে এখন অন্তত ৭ কোটি টাকার সম্পদ আছে। এ ছাড়া জলিল ঢাকার আশুলিয়া থানার চারাবাগ চৌরাস্তা এলাকায় ৭ শতাংশ জমি কিনে গড়ে তুলেছেন ছয়তলা ভবন। এখানেও জমি ও ভবনের বাজার মূল্য অন্তত পাঁচ কোটি টাকা। আশুলিয়ায় এই জলিল স্থানীয়দের কাছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
জলিলের ডাকাতির টাকায় অন্যের ঠিকাদারি ব্যবসা:
স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বরিশাল বিমানবন্দর থানার খানপুরায় জলিল মোল্লার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। তার অর্থায়নে ইশতিয়াক আহমেদ জুয়েল ও কামাল পারভেজ নামে দুজন যৌথভাবে ঠিকাদারি কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ইশতিয়াক স্থানীয় যুবদল নেতা ও কামাল পারভেজ ওয়ার্কার্স পার্টির যুব মৈত্রীর নেতা হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই কামাল পারভেজ র্যাবের হাতে আটক হন। তখন আওয়ামী লীগ সরকারের এক মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাকে ছাড়া হয়।
অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইশতিয়াক আহমেদ জুয়েল কালবেলাকে বলেন, জলিল তার প্রতিবেশী। তার ব্যবসায় জলিলের বিনিয়োগের তথ্য সঠিক নয়।
তিনি আরও জানান, তার নিজের নামে লাইসেন্স নেই। ওয়ার্কার্স পার্টির যুব মৈত্রীর নেতা কামাল পারভেজ তার ব্যবসায়িক পার্টনার। তার বাবা ও খালুর নামে থাকা লাইসেন্স দিয়ে বিভিন্ন টেন্ডারের কাজ করেন। সড়ক ও কালভার্টসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ করেন।
গ্রামেও রয়েছে ডাকাতির সহযোগী: জলিল মোল্লার সঙ্গে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামের শাহজাহান হাওলাদারের ছেলে আব্দুল করিম হাওলাদার, পারভেজ এবং হালিম হাওলাদারের ছেলে মো. সোহানের বিরুদ্ধে। উত্তরার ছিনতাইয়ের ঘটনায় আব্দুল করিম হাওলাদার ও সোহান জড়িত রয়েছে। বর্তমানে তারা আত্মগোপনে রয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
জলিল মোল্লার ভাই দলিল মোল্লা কালবেলাকে বলেন, তার ভাই জলিল বহু বছর আগে সৌদি আরবে ছিলেন এবং সেখানে গাড়ি চালাতেন। এর আগে ২০০২ সালে ঢাকায় গাড়ি চালাতেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে শায়েস্তাবাদে জমি কেনা এবং ঘের লিজ নেওয়া শুরু করেন।
দলিল মোল্লা স্বীকার করেন, তার ভাই আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাকে একাধিকবার ওই পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি পরিবারের কারও কথা শোনেননি।
ঢাকায় ফিলিং স্টেশনের টাকা ছিনতাইয়ে ফের আলোচনায় জলিল: ডিবি সূত্র জানায়, উত্তরার ফিলিং স্টেশনের টাকা ছিনতাইয়ে সোর্স হিসেবে কাজ করেছে জলিলের সহযোগী আবদুল হাকিম। এই হাকিম পেশাদার ডাকাত হলেও উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন গাড়ি গ্যারেজে মেকানিকের ছদ্মবেশে থাকত। ওই ফিলিং স্টেশনের গ্যারেজেও কিছুদিন কাজ করেছে। ওই সময়ে সে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। জানতে পারে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে কোটি টাকার বেশি ব্যাংকে পাঠানো হয়। এই তথ্য পেয়েই মাঠে নামে জলিল মোল্লা। যশোরের এক অস্ত্র কারবারির কাছ থেকে দুই লাখ টাকায় অস্ত্র ভাড়া করা হয়। সংগ্রহ করা হয় হুবহু দেখতে খেলনা পিস্তলও। এ ছাড়া চক্রের আরেক সদস্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যাকেট। এরপর গত ৯ আগস্ট সকালে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যাংকে নিয়ে যাওয়ার সময় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে ফিরে প্রবাসীদের ঘিরেই ডাকাতি চক্রে জড়িয়ে পড়ে জলিল। বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের বাড়ি ফেরার গাড়িরচালক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ডাকাতি করত জলিল ও তার দল। এক সময়ে এই চক্রের মূলহোতা ছিল বাবুগঞ্জের মানিককাঠি গ্রামের মামুন, তার ভাই দস্তগির এবং চাচাতো ভাই সোহেল। পরে তিনজনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এরপর নিজেই হাল ধরে জলিল। শুরু করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা ছিনতাই।
ডাকাত চক্র প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, জলিল ও তার দল ব্যাংক পাড়াসহ আর্থিক খাতের আতঙ্ক। বিমানবন্দর-কেন্দ্রিক অপরাধ চক্র থেকে বের হয়ে জলিল যোগ দেয় এক সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড শাহিন ওরফে শাহিন পুলিশের দলে। শাহিন তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। যার পুরো নাম গোলাম মোস্তফা শাহীন। পুলিশে কনস্টেবল এই শাহিন ২০০৮ সালে বিভিন্ন অপকর্মের কারণে চাকরিচ্যুত হন। চাকরি হারিয়ে পুলিশের অপরাধীর খাতায় ওঠে তার নাম।
ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ফিলিং স্টেশনের টাকা ছিনতাইয়ের পর চক্রটি মিরপুর সনি সিনেমা হলের পাশের একটি গলিতে গিয়ে টাকা ভাগ করে। জলিল একাই ৫০ লাখ টাকা নিয়ে আশুলিয়ায় তার ভাগ্নি জামাইর কাছে রেখে চলে যান নিজ গ্রামে। সেখানেও নিজেকে নিরাপদ মনে না করায় বাসে করে ঢাকায় আসে। এরপর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে। সেখান থেকেই র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. ইলিয়াস কবির কালবেলাকে বলেন, জলিল মূলত ডাকাতি-ছিনতাইয়ের মাস্টারমাইন্ড। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এই অপরাধী দলগুলোতে তার লোক রয়েছে। যেখানেই বড় ধরনের ডাকাতি ও ছিনতাই হয়, সেখান থেকেই বড় ভাগ পায় এই জলিল। এভাবেই অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে সে।