Image description
ঢাকা নির্বাচনের পর বেশির ভাগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে প্রশাসক করে দলীয় নেতাদের বসিয়েছে বিএনপি সরকার । এবার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও দলের নেতাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলো । সরকারি পদগুলোতে এভাবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়োগে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি নিজেদের রেষারেষিকে দুষছেন সরকারি কর্মকর্তারা । সবশেষ ২৩ জুলাই ১১ টি সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের পদে বিএনপি এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের গ্রেড -২ পদমর্যাদায় এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে । এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের ওই পদগুলোতে এত দিন অতিরিক্ত সচিবদের নিয়োগ দেওয়া হতো । কোনো কোনো সময় সরকারের নিয়মিত কর্মকর্তাদের বাইরে থেকে চুক্তিতে

সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ » ১১ টি দপ্তরে ২৩ জুলাই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের চুক্তিতে নিয়োগ । » পদগুলোতে এত দিন অতিরিক্ত সচিবদের নিয়োগ দেওয়া হতো । » বিশেষজ্ঞরা বলছেন , এসব পদে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োজন আছে । নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা । সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো . আব্দুল বারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি । জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ , পদোন্নতি ও প্রেষণ ( এপিডি ) অনুবিভাগ থেকে এসব পদে নিয়োগ

দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় । এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো . আকনুর রহমান গতকাল রোববার রাতে আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ কীভাবে এসব পদে নিয়োগ হয়েছে , সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না । কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন । আমরা নির্দেশনা পেলে শুধু আদেশ জারি করি । ”

জনপ্রশাসন বিশেজ্ঞরা বলছেন , প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়া সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । যদিও সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন , তাঁদের নিজেদের রেষারেষির কারণেই এভাবে দলীয় লোক বসানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে । গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর চট্টগ্রাম বাদে সব সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে । এ ছাড়া বেশির ভাগ জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে বিএনপি নেতাদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার । অন্যদিকে বর্তমান ৮২ জন সিনিয়র সচিব ও সচিবের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব , প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব , জনপ্রশাসন সচিব , স্বরাষ্ট্রসচিব , নির্বাচন কমিশন সচিবসহ ২১ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন ।

কর্মকর্তাদের রেষারেষিতে রাজনৈতিক নিয়োগ

যেখানে যে নেতা নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া মো . শামসুজ্জামান সুরুজ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া মো . মামুন হাসান বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য । এ ছাড়া বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া মো . জাকির হোসেন যুবদল নেতা । বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান করে বসানো হয়েছে বিএনপির রংপুর বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেককে । বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক । আর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক এ টি এম আব্দুল বারী ড্যানীকে । বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ রাশেদুল হক বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক । সম্প্রতি বিলুপ্ত জাতীয়তাবাদী যুবদলের সহসভাপতি মো . কামরুজ্জামান দুলালকে করা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব । বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ পাওয়া

কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সহসম্পাদক । বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মো . সালাহউদ্দিন সরকার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি । বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বিএনপির ঢাকা বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক । অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ( ইসি ) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া মো . সামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম - সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন । সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে এসব বিএনপি নেতার নিয়োগের খবর ছবিসহ বিএনপি মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে । ইসিতে সামসুল আলমের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ( এনসিপি ) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী । ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন , নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান । রাজনীতিতে যুক্ত একজন ব্যক্তিকে সেখানে কীভাবে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ করা যায় ? আর কিছুদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে । সেই নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবেন অতিরিক্ত সচিব ; যিনি কিছুদিন আগে একটি দলের নেতা ছিলেন , তিনি কি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করবেন ? ক্ষোভের পাশাপাশি নিজেদের রেষারেষিকে দুষছেন আমলারা : দলীয় ব্যক্তিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের

পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা । তবে নাম - পরিচয় প্রকাশ করে কেউ কথা বলতে চাননি । একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন , “ যেসব পদে আমাদের নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল , সেখানে নিয়োগের জন্য আমাদের বিবেচনায়ই নেওয়া হলো না । বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবদের মধ্যে সবাই কি অযোগ্য ? ” তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের পদে বিএনপি নেতাদের নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার । গতকাল আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন , ‘ কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন এমন দলাদলি , যাকে নিয়োগ দেয় , তারা তার বিরুদ্ধেই লাগে । এখন সরকারেরও তো ধৈর্যের সীমা আছে । সবাই যদি সবার বিরুদ্ধে লাগে , সরকারও তো বিব্রত হয় । এ জন্য হয়তো সরকার মনে করছে , নিজেদের লোক দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান চালানো ভালো । ” তবে সরকার চাইলে যে কাউকে যেকোনো জায়গায় চুক্তিতে নিয়োগ দিতে পারে জানিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন , তবে ওই সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মতো প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তাঁদের আছে কি না , তা দেখতে হবে । প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কিছু কারিগরি দিকে আছে । ওই সব বিষয়ে যাঁরা যোগ্য ও দক্ষ , তাঁদেরই সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয় । এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে সেখানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।