বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক ‘অন্ধকার যুগ’ পার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, এ কালো অধ্যায়ের সূচনা মূলত এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের খানের হাত ধরে। তার আমলে গড়ে ওঠা বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত এনবিআরকে। এই সিন্ডিকেট রাজস্ব আহরণে মনোযোগী না হয়ে বদলি-পদোন্নতি নিয়ে ছিল ব্যস্ত। আবার এনবিআর পৃথকীকরণের আন্দোলনের অজুহাতে অন্তত ৩৯ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ডজনখানেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এনবিআরকে একটি বিশৃঙ্খল সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। তার আমলে, অর্থাৎ রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, আব্দুর রহমান খান ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিলে আবদুর রহমান খানকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করে। আবদুর রহমান ছিলেন আয়কর ক্যাডারের কর্মকর্তা। এ কারণে তিনি আয়কর বিভাগের কয়েকজন এবং শুল্ক অনুবিভাগে নিজ অঞ্চলের কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল সিন্ডিকেট। রাজস্ব আহরণে মনোযোগী না হলেও সিন্ডিকেট সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করতেন এনবিআর। বদলি-পদোন্নতি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের ‘খাস অনুসারীদের’ সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। আর এনবিআর পৃথকীকরণের আন্দোলনের অজুহাতে অন্তত ৩৯ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ডজনখানেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ছাড়া হয়রানির অজুহাতে রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া অডিট-প্রিভেন্টিভ এক আদেশের মাধ্যমে বন্ধ করে দেন চেয়ারম্যান। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
রাজস্ব আহরণের চিত্র: এনবিআরের রাজস্ব আহরণের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ে এনবিআর আদায় করেছে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর আদায় করেছে ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এনবিআরের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সময় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর আদায় করেছে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক ধাক্কায় রাজস্ব ঘাটতি দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এনবিআর আদায় করেছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। সদ্য সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের আমলে এনবিআরের ইতিহাসে রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতির নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব উদ্ঘাটনের মূল পথ বন্ধ করে দেন চেয়ারম্যান: এনবিআরের দায়িত্ব পেয়েই হয়রানির অভিযোগ তুলে আয়কর ও কাস্টমস-ভ্যাটের রাজস্ব উদ্ঘাটনের মূল পথ অডিট ও প্রিভেন্টিভ বন্ধ করে দেন আবদুর রহমান খান। একই সঙ্গে হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বন্ধ করে দেন রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে পাবলিক প্রোগ্রামে দোষারোপ শুরু করেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়। যার ফল প্রায় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি। অবসরের আগে আবদুর রহমান খান শেষ পর্যায়ে এসে সেই অডিট-প্রিভেন্টিভ চালু করেন।
এ নিয়ে সম্প্রতি আবদুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। আরও যত অনিয়ম-অভিযোগ: এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে প্রথমেই ভ্যাট ও শুল্ক অনুবিভাগে নিজের লোকজনকে পদায়ন করেন আবদুর রহমান। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে থাকাকালে এক কর্মকর্তা তার অনুরোধ না রেখে ভ্যাট ফাঁকির মামলা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হন তার প্রতি। পরে সেই কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়।
একবার চেয়ারম্যানের পছন্দের ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান সিনহার প্রতিষ্ঠানের নামে একটি মদের চালান আসে। সেটি আটকের পর শুল্ক কর্মকর্তারা আমদানিকারকের নাম উল্লেখ করে ফৌজদারি মামলা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই কর্মকর্তাদের বছরজুড়ে নানাভাবে হয়রানি করেন। জ্যেষ্ঠ একজন কমিশনারকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করেন।
এখানেই শেষ নয়, ব্যবসায়ীদের হয়ে পণ্য চালান খালাসে অ্যাসেসমেন্ট কমিটি চলাকালে ফোন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। শুধু তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে এক কর্মকর্তাকে প্রথমে বদলি এবং বদলির ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই আন্দোলনে অংশগ্রহণের অজুহাতে সাময়িক বরখাস্ত করেন। অথচ তার সিন্ডিকেটের এমনও কর্মকর্তা ছিলেন, যারা এনবিআর পৃথকীকরণ আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকেও পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন পান।
কর্মকর্তাদের এমন বৈষম্যের কারণে মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
অবসরের আগেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষা নিয়ে আবদুর রহমান ঘটান আরেক কাণ্ড। লাইসেন্সিং বিধিমালায় পরীক্ষার রেজাল্ট স্থগিতের কোনো নিয়ম নেই। তার কারণে এখনো ঝুলে আছে রেজাল্ট। কথিত অভিযোগ তুলে অবসরের দিন তিনি তদন্ত কমিটিও করে দিয়ে গেছেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে এনবিআরে।
কিছু বড় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটেও বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন আব্দুর রহমান। যেমন, ভ্যাটের সুদ মওকুফ, তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমার বিধানে। এসব সিদ্ধান্ত নতুন অর্থবছরে নগদ অর্থ প্রবাহে সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আবদুর রহমানের সিন্ডিকেট সদস্যরা নতুন প্রশাসনেও প্রভাবশালী: সূত্র জানায়, আবদুর রহমান খানের সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যরা নতুন প্রশাসনেও প্রভাবশালী হিসেবে আবির্ভাব হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে এখনো তাদের আধিপত্য চলছে। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়েও রয়েছে তাদের আধিপত্য। আয়কর বিভাগের বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে রয়েছেন তারা। এ ছাড়া কাস্টম হাউস থেকে শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দা ও ভ্যাট কমিশনারেটের নিয়ন্ত্রণ এখনো সাবেক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজনদের হাতে।
শুল্ক ও ভ্যাটে সাবেক চেয়ারম্যানের সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন ও বেলাল আহমেদ চৌধুরীর বলয়ের প্রধান সদস্য মো. আরিফুল ইসলাম এখনো শুল্ক গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবেই বহাল রয়েছেন। সংস্থাটির কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মহাপরিচালক কিছু কর্মকর্তাকে সরালেও বহালতবিয়তে রয়েছেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। শুধু শুল্ক গোয়েন্দা নয়, ঢাকা কাস্টম হাউস থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসেও সাবেক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজনরা তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছেন।