Image description

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পর্যায়ের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ১০০ নম্বরের ক্রেডিট কোর্স হিসেবে তা পড়ানো হবে। মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদেরও বাধ্য হয়ে পড়তে হবে এই দুই বিষয়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কাউন্সিলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিটি বিভাগের জন্য তৈরি হয়েছে পৃথক সিলেবাস।

এদিকে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভে ফুঁসছেন হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, একটি ধর্মের ওপর পাঠ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের ১৩০তম সভায় বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স দুটিকে সব বিভাগে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ক্রেডিট কোর্স হিসেবে অন্তর্ভুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পরে কার্যবিবরণীর ওপর লিখিত কোনো সংশোধনী বা আপত্তি না থাকায় ওই বছরের ১ নভেম্বর কোর্স দুটিকে অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। তবে কার্যবিবরণীর ওপর আপত্তি না থাকলেও একাডেমিক কাউন্সিলে উপস্থিত একাধিক সদস্যের মৌখিক আপত্তি ছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মনজুরুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইসলামিক স্টাডিস কোর্স বাধ্যতামূলক করা সঠিক। গত একাডেমিক কাউন্সিলে সিদ্ধান্তটি হয়েছে।’

সম্প্রতি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি জানাজানির পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত আপত্তি জানান। এ ছাড়া উপাচার্য নকীব, ছাত্র উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তার পরও সুরাহা হয়নি। উল্টো ছাত্র উপদেষ্টার মাধ্যমে জানানো হয়, একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোর্সটি বহাল রাখা এবং সে অনুযায়ী সিলেবাস প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে একাডেমিক কাউন্সিলে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষে এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সম্প্রতি, আবারও নতুন উপাচার্যসহ প্রশাসনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টির পূজা উদযাপন পরিষদ ও অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সমাধানের জন্য মানববন্ধন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেছেন, আমাদের অবস্থান কোনো ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা বা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক কোর্স সব ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক ক্রেডিট কোর্স হিসেবে নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ প্রত্যাশা করি, যেখানে সব শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম-অধিকার এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির বিষয়টি সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে। তারা আরও বলেন, বাংলাদেশ স্টাডিজ একটি জাতীয় ও নাগরিক বিষয় হওয়ায় সেটি সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামিক স্টাডিজের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় ও পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী আগস্ট থেকে শুরু হবে পাঠদান। ওইদিন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ইউজিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা পাঠদান উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়ায় এই শিক্ষাবর্ষ থেকে সব শিক্ষার্থীকে এ দুই বিষয়ে পড়তে হবে।

একাধিক কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী জানান, ইসলামিক স্টাডিজ সব শিক্ষার্থীর পড়ানোর বিষয়টি দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। না হলে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া সব শিক্ষার্থীকেই এই কোর্সে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর তা বাতিল করলেও নানা জটিলতা তৈরি হবে। তারা আরও বলেন, এর আগেও এ দুটি বিষয় নন ক্রেডিট হিসেবে বাংলায় পড়ানো হতো। তখন মুসলিম শিক্ষার্থীরা ইসলামিক স্টাডিজ আর নন-মুসলিম শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়টি পড়তেন। ফলে কোনো মতানৈক্য তখন তৈরি হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষার্থী পূজা দাস, পঞ্চমী দেব ও শিপন নাথ বলেন, আগ্রহ থেকে অনেকেই ইসলামের নানা ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। মুসলামনরাও হিন্দু কিংবা অন্য ইতিহাস নিয়ে পড়েন। এটা খারাপ কিছু নয়। তবে একটি ধর্মের ইতিহাস অন্য ধর্মের মানুষকে পড়তে বাধ্য করা অনুচিত।

পূজা উদযাপন পরিষদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি পংকজ রায় বলেন, এটা অন্য ধর্মের ওপর আঘাত দেওয়ার মতো একটা বিষয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু মুসলিম নয়, নন-মুসলিম অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। আমরা এরই মধ্যে আপত্তি জানিয়েছি। সুরাহা না হলে আমরা সবাই মিলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের একটি বিভাগের শিক্ষক বলেন, আমাদের ফ্যাকাল্টিসহ প্রায় সব ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেখানে আমরা এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। তখন নীতিনির্ধারকরা আমাদের জানিয়েছেন, এটা যেহেতু বিশেষায়িত ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়; সেজন্য ইসলামের ওপর ১০০ মার্কের একটি কোর্স পড়ানো যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ওপর একটি কোর্স আছে, ভারতের কলকাতায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একটি কোর্স পড়তে হয়। এভাবে বিশ্বের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে বিষয় বা প্রেক্ষাপটে ওপর প্রতিষ্ঠিত তা নিয়ে একটি কোর্স পড়তে হয়। সেই হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান মূল লক্ষ্য যেহেতু ছিল ইসলামিক জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় সাধন। সুতরাং এখানে এই কোর্স থাকতেই পারে—এমন যৌক্তিকথা আমাদের দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রশ্ন করেছিলাম নন-মুসলিম শিক্ষার্থীদের কী হবে। তখন যুক্তি দেখানো হয়েছে, ইসলাম মৌলিক বিষয়গুলো কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তবে বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামের চিন্তা-ধারণা ইত্যাদি তুলে ধরা হবে।

কয়েকটি বিভাগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, ইসলামিক স্টাডিজ কোর্সটি ইংরেজিতে পড়ানো হবে। তবে এর সিলেবাস কেন্দ্রীয় না বিভাগভিত্তিক করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটা বিভাগের সিলেবাস কমিটির পর ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে পাস হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এপেক্স বডি একাডেমিক কাউন্সিলে উঠবে। সেখানেই চূড়ান্ত হবে সব বিভাগ সিলেবাস আলাদা রাখবে, না কেন্দ্রীয়ভাবে সিলেবাস তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. এ কে এম মতিনুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আগামী একাডেমিক কাউন্সিলে উত্থাপন করা হবে। সেখানে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে। আগামী আগস্ট মাসের শেষ দিকে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে।’

সার্বিক বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ইসলামকে প্রাধান্য দেবে, এটা স্বাভাবিক। তবে ইসলাম ধর্ম শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা, অবহেলা, পারস্পরিক সম্মান যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে সরকারের আনুগত্যে একটি ধর্ম নিয়ে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় করা ঠিক কি না, এটা নিয়ে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তা সবাই মেনেও নিয়েছে। কেউ বড় কোনো বিতর্ক তোলেনি।