ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ যান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঠিক কী করবে — এখন পর্যন্ত তা পরিষ্কার নয় । মহাসড়কের পাশাপাশি নগরীর প্রধান সড়কে এই যান চলবে কি চলবে না , তা নিয়ে একেক সময় একেক ঘোষণা এসেছে । কিন্তু বাস্তবে কোনো কিছুতেই এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি । কখনো কখনো অভিযান হলেও চালকদের আন্দোলনের কারণে এই যান বরং আরও দাপটের সঙ্গে রাস্তায় ফিরে এসেছে ।
সরকারের
নীতিনির্ধারকেরাই বলছেন , ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে কীভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে , কোন সংস্থা লাইসেন্স দেবে , কোন সড়কে চলবে , কী ধরনের নকশা ও নিরাপত্তা মান থাকবে , এমনকি চার্জিং ব্যবস্থাও কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে — এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নীতিমালা হয়নি । আর এই সুযোগে প্রতিদিন সড়কে যুক্ত হচ্ছে নতুন অটোরিকশা । রাজধানী ঢাকা থেকে জেলা শহর , এমনকি গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়ছে । বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক হিসাবে দেখা গেছে , গত সাত থেকে আট বছরে দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা
প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় । আমাদের অভিযানের কারণেই বর্তমানে প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম । আনিসুর রহমান , অতিরিক্ত কমিশনার ( ট্রাফিক ) , ডিএমপি
বেড়েছে প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ লাখ , যা আগের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি । সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় , গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল । তবে চালকদের আন্দোলনের মুখে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায়নি । এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি । জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে
শুধু নীতিমালা করলেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না । নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন অটোরিকশা তৈরি ও বাজারে আসা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত । অধ্যাপক মো . হাদিউজ্জামান যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
গেলেও নীতিমালা অনুমোদনের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি । নীতিমালার কাজ চলছে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে , খসড়া নীতিমালায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন , লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ , চলাচলের উপযোগী সড়ক , নিরাপত্তা মান , যানের নকশা , ব্যাটারি ও চার্জিং স্টেশনের মানদণ্ড এবং তদারকি ব্যবস্থার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে । স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে এ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে । এতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন , সড়ক পরিবহন ও
মহাসড়ক বিভাগ , স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা যুক্ত রয়েছে । এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক ( পরিবহন , অতিরিক্ত দায়িত্ব ) মো . মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আজকের পত্রিকাকে বলেন , ' ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়ে মতামত দিয়েছি । তবে এখনো চূড়ান্ত নীতিমালা হাতে পাইনি । নীতিমালা জারি হলে সেটির আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে । '
বলেন ,
মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আরও ‘ বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের । আর বিদ্যমান রিকশা লাইসেন্সের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সামঞ্জস্য না থাকায় আমরা এসব লাইসেন্স নবায়ন করছি না । নীতিমালা হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে । বর্তমানে এ ধরনের অটোরিকশার সংখ্যা নিয়েও আমাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই । ” ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপক ( পরিবহন , অতিরিক্ত দায়িত্ব ) মো . মেহেদী হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন ,
‘ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো নীতিমালা নেই । এ কারণে এ বিষয়ে কার্যকরভাবে কাজ করা যাচ্ছে না । স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা জারি হলে তাতে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ও করণীয় স্পষ্ট থাকবে । এরপর সেই নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে । ' তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনি এখতিয়ার । সড়ক পরিবহন আইন , ২০১৮ অনুযায়ী মোটরযানের নিবন্ধন , ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ( বিআরটিএ ) । কিন্তু ব্যাটারিচালিত কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ । এতে কোন সংস্থা নিবন্ধন দেবে , চালকদের লাইসেন্স কে দেবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কীভাবে দায়িত্ব ভাগাভাগি করবে , তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে । অটোরিকশা নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কারও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি । তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান , এই নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি । হিসাবের বাইরে কয়েক লাখ অটোরিকশা : দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নির্ভুল কোনো সরকারি হিসাব নেই । বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তার মতে , বর্তমানে এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ হতে পারে । শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ১৫ লাখের বেশি । তবে বিআরটিএ ২০ ধরনের
মোটরযানের নিবন্ধন দিলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সেই তালিকায় নেই । ফলে বিপুলসংখ্যক যানবাহন নিবন্ধনের বাইরে থেকেই চলাচল করছে । বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ( সিপিডি ) গবেষণায় একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে । গবেষণায় বলা হয়েছে , দেশে প্রায় ৬০ লাখ ইলেকট্রিক থ্রি- হুইলার রয়েছে , যার প্রায় ২০ লাখই রাজধানীতে । প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ মানুষ এসব যান ব্যবহার করেন । অথচ মাত্র ৫ শতাংশ নিবন্ধিত , বাকি ৯৫ শতাংশই অনুমোদনহীন । গবেষণায় আরও বলা হয়েছে , এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি হলেও মোটর , কন্ট্রোলার ও চার্জারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি করা হয় । এগুলো দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট , অর্থাৎ দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে । ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন মাত্র ৩ হাজার ৩০০ টি হলেও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬ টি । এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার । আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী , ২০১৮ সালের দিকে দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ১৬ লাখ । বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮০ লাখে দাঁড়িয়েছে । এখন দেশে চলাচলকারী এসব অটোরিকশার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ রাজধানী ঢাকায় এবং ৬০ লাখ ঢাকার বাইরে চলাচল করছে । তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধিত যানবাহনের আওতাভুক্ত না হওয়ায় এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য
তথ্য নেই । ফলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া এই তথ্যও যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই । সড়কে অভিযান , কিন্তু শৃঙ্খলা ফিরছে না : সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে , ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখনো প্রধান সড়কেও দাপটের সঙ্গে চলাচল করছে । কোথাও উল্টো পথে , কোথাও সিগন্যাল অমান্য করে , আবার কোথাও সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা করছে ।
সব
শুধু রাজধানীতেই নয় , দেশের প্রায় বড় শহরেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবাধে চলাচল করছে । একই সঙ্গে জাতীয় মহাসড়কেও নিয়ম উপেক্ষা করে এসব অটোরিকশার চলাচল অব্যাহত রয়েছে । ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ( ট্রাফিক ) আনিসুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন , ' ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নীতিগতভাবে এখনো বলার মতো নতুন কোনো অগ্রগতি হয়নি । তবে প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল ঠেকাতে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে । প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় । আমাদের অভিযানের কারণেই বর্তমানে প্রধান সড়কে এসব যানবাহনে সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম । নীতিমালা চূড়ান্ত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ সে অনুযায়ী নেওয়া হবে । ' যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো . হাদিউজ্জামান বলেন , “ শুধু নীতিমালা করলেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না । নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন অটোরিকশা তৈরি ও বাজারে আসা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত । তা না হলে
প্রতিদিন নতুন অটোরিকশা সড়কে যুক্ত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে । ' তিনি আরও বলেন , নীতিমালায় অটোরিকশার নিরাপত্তা মান , কারিগরি স্পেসিফিকেশন , কোন সড়কে চলবে , কত সংখ্যক চলবে এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতটি অটোরিকশার মালিক হতে পারবেন , এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে । দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে : সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের থ্রি - হুইলারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও । রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে , ইজিবাইক , সিএনজিচালিত অটোরিকশা , অটোরিকশা , অটোভ্যান , লেগুনা , মিশুকসহ বিভিন্ন থ্রি- হুইলারের দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৭৬ জন নিহত হয়েছেন , যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ১৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ । স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন , করিমন , ভটভটি , আলমসাধু , মাহিন্দ্রা ও টমটমের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৯ জন , যা মোট মৃত্যুর ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ । রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন , ‘ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো , এসব ধীরগতির যান মহাসড়কে চলাচল করছে । আমাদের সড়ক নকশা এ ধরনের যানবাহনের জন্য উপযোগী নয় । আর শুধু নীতিমালা করলেই হবে না , অটোরিকশাকে নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে । একই সঙ্গে সার্ভিস রোড , আন্ডারপাস বা ওভারপাসসহ নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে । ’