অনেক গুরুতর প্রশ্নের মুখে সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলম গ্রুপকে সহায়তা করাসহ বিভিন্ন বিষয় এখন সামনে চলে আসছে। দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও কম নয়। শুধু তাই নয়, গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে জুলাই গণহত্যায় তার সমর্থন থাকার বিষয়টিও। সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারিতে মো. সাহাবুদ্দিন ও তার কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্স জড়িত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার এ বিষয়ে শুনানিও হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় দায়মুক্তি দেওয়ায় মো. সাহাবুদ্দিনকে এসব অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে কি না-সেই প্রশ্ন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, সংবিধানে রাষ্ট্রপতি থাকার কার্যকালকে দায়মুক্তি দেওয়া আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনের আগের ও পরবর্তী জীবনের কর্মকাল নিয়ে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেটি অবশ্যই তদন্ত করা উচিত। বিশেষ করে এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার থাকার কর্মকাল; ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় তিনি যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন এবং তার বিরুদ্ধে যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগ ওঠে, সেটি অবশ্যই স্বচ্ছতা-জবাবদিহির প্রশ্নে তদন্ত হওয়া উচিত। তারা মনে করেন, গণমাধ্যমে বিদায়ি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, সে বিষয়ে নিজের ইমেজ সুরক্ষার প্রশ্নে ওনারই (মো. সাহাবুদ্দিন) উচিত হবে সরকারের কাছে তদন্তের দাবি করা।
সদ্য পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার আগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনার ও বিচার ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট জেএমসি বিল্ডার্সেরও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এসব দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, এস আলম গ্রুপকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারে সহায়তা করাসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণসাপেক্ষে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ রয়েছে। কারণ হিসাবে তারা এও বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগের অনিয়ম ছাড় দেওয়া হলে দেশে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুতে আন্দোলনেরও সুযোগ পাবে। তবে তারা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে মো. সাহাবুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার না চাইলে কিছুই হবে না।
যদিও মো. সাহাবুদ্দিনের বিষয়ে রোববার সরকারের দুই মন্ত্রী দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদক চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। তদন্ত শেষে জনস্বার্থ বিবেচনায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় স্বৈরাচারের শেষদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড; তার (ইনডেমনিটি) দায়মুক্তি আছে। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যথাযথ তদন্ত করে তার বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। সংবিধানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়কার কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনায় যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাষ্ট্র যদি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা সত্য হয়ে থাকলে এ নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। দেশে ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাটের হোতা এস আলমের ঘটনায় বিশাল চক্র রয়েছে। সবাইকে আইনের আওতায় আনা দরকার। নইলে এস আলমকে রক্ষা করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক।
এদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং সেক্টরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে রোববার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো তদন্ত না হলেও পুরোনো কোনো ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও বাকশালের বিভিন্ন পদে থাকা মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করলে তিনি সেটি ধামাচাপা দেন। এছাড়া তিনি এস আলম গ্রুপেরও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে দেশের ব্যাংকব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া এবং নামে-বেনামে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা উঠিয়ে পাচার করার অভিযোগ থাকলেও দুদক কমিশনার থাকাবস্থায় তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ বিষয়ে দেশে-বিদেশে তদন্ত হয়েছে। এখনো তদন্ত চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান। এছাড়া দুদকের কমিশনার থাকা অবস্থায় মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইসলামী ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় মো. সাহাবুদ্দিনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে জেএমসি বিল্ডার্সের ২৪টি কোম্পানির নাম দিয়ে মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করেন। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্বপর্যন্ত সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এসব শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন। কেননা তিনি তখন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করে এসব শেয়ার অনুমোদন করেন। তিনি বলেন, রিটে আমাদের চাওয়া-এস আলম কর্তৃক দখলকৃত শেয়ার তার উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার বা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। এছাড়া ঋণ জালিয়াতি ও শেয়ার জালিয়াতির অপরাধে অভিযুক্ত যেই হোক, তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।
শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের পেছনে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা হরিলুটের ঘটনায় দুদক ৫৬টি মামলা করলেও ব্যাংকটির মূল কারিগর এবং তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং পরিচালনা পর্ষদের কাউকেই আসামি করা হয়নি। অথচ ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল এই পর্ষদই। অভিযোগ রয়েছে, সাহাবুদ্দিনের সরাসরি হস্তক্ষেপে বাচ্চু ও তার প্রভাবশালী সহযোগীদের রক্ষা করা হয়। প্রায় আট বছর পর ২০২৩ সালে যখন চার্জশিট দাখিল করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে স্বীকার করেন যে, তৎকালীন কমিশনারদের চরম রাজনৈতিক চাপ ও বাধার কারণে মূল আসামিদের আগে চার্জশিটভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তিনি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেরও উপদেষ্টা হিসাবে আর্থিক সুবিধাদি নেন। এছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার পেছনেও সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গুলশানে তিনি একাধিক ফ্ল্যাট নিয়েছেন। বিদেশেও সম্পদ গড়েছেন। মালয়েশিয়ার ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় তিনি অন্তত দেড় লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত বিনিয়োগ করে রেসিডেন্সি সুবিধা নিয়েছিলেন। দুবাইয়ের একাধিক ব্যাংকে তার বিপুল গোপন অর্থ জমা রাখা এবং ‘ওয়ারাদ জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’ নামক একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের তথ্য বেরিয়েছে। এছাড়া তার দ্বৈত নাগরিকত্বেরও অভিযোগ রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা ও সন্তান মো. আরশাদ আদনানের নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। আরশাদ আদনানের ‘প্রিয়তমা’ ও ‘রাজকুমার’ সিনেমা নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন ও দুদক কমিশনার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অনুগ্রহ এবং এস আলম কোটায়। দলীয় অনেক সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে বিস্ময়করভাবে তাকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেওয়া হয়। এর প্রতিদান দিয়েছেন একতরফা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা ও জুলাই গণহত্যায় চুপ থাকার মধ্য দিয়ে। এমনকি ওই সময়ে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে কোনো পদক্ষেপও নেননি সাহাবুদ্দিন। যদিও বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বলে বক্তব্যও দিয়েছেন।