তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির একক আধিপত্য চায় না দলটির শরিক দলগুলো। সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর প্রথমবারের মতো সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা এ মনোভাব ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে শরিক দলের নেতারা বলেন, তৃণমূলে বিএনপির একক আধিপত্যের কারণে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁরা বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। আন্দোলনের অবদান অনুযায়ী মূল্যয়ন করা হবে। বাস্তবতা উল্টো।
বৈঠক সূত্র জানান, যুগপৎ আন্দোলনের বাস্তবতা ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি শরিক দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। আয়োজনে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ই হয়নি; উঠে এসেছে শরিকদের প্রত্যাশা, হতাশা ও মূল্যায়নের দাবি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নও। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন এবং শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস দেন।
সূত্রমতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিক দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। আমাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা এবং জুলাই সনদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। ৩১ দফার আলোকে হোক, জুলাই সনদের আলোকে হোক আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব। জনগণ প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, অত্যাচারিত-নির্যাতিত হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। অনেক দিন বসার সুযোগ হয়নি, তাই এ আয়োজন। মুরুব্বিরা যা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি মোটেও দ্বিমত করব না। তাদের মনে যে কষ্টের কথাগুলো আছে, তা স্বাভাবিক। তাঁরা বয়সে আমার চেয়ে বড়; ছোট ভাই হিসেবে আমি তাঁদের সব বিষয় মেনে নিচ্ছি এবং দুঃখ প্রকাশ করছি।’
বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটি মূলত শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন ছিল। ক্ষমতায় না থাকা ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।’ তিনি জানান, কয়েকজন নেতা সরকারে অংশীদার হওয়ার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘রাজনীতির ক্ষেত্রে সরকার অনেক পিছিয়ে পড়ছে।
নির্বাচনের পর একলা চলো নীতি অবলম্বন করছেন কি না-শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস-সন্দেহ বেড়ে চলেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছি, এটা শরিকদের সঙ্গে ফেয়ারওয়েল বৈঠক কি না? জবাবে তিনি স্মিত হেসে বলেন, এটা ওয়েলকাম ডিনার। এখন থেকে শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’
গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সরকার গঠনের পর শরিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের কেন্দ্র বা জেলা কোনো পর্যায়েই মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় অনেক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও জানানো হচ্ছে না। এতে মানসিক কষ্ট ও চরম বিব্রতবোধ তৈরি হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে শরিকদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও পাঁচ মাসে জ্যেষ্ঠ নেতারা কোনো খোঁজখবর নেননি। তাই তাঁরা সরকারে অংশীদারির দাবি জানিয়েছেন।’
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ জানান, শরিকরা তৃণমূলে বিএনপির একক আধিপত্যের কারণে সৃষ্ট বিরোধ, যুগপৎ আন্দোলনের বাস্তবতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে শুনে শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ইসলামি শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। এতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
শুভেচ্ছাবিনিময় শেষে নৈশভোজে ৪১টি রাজনৈতিক দলের ১৮৪ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বৈঠকে অংশ নেয়নি।
জানা গেছে, ক্ষমতার পাঁচ মাস পার হলেও বিএনপি সরকারে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই দল দুটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে ছাড়ের প্রত্যাশা করেছিলেন আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী, জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব।
কিন্তু পাননি। এ ছাড়া অসুস্থ আবদুর রবকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ দেখতে না যাওয়ায় মনঃক্ষুণ্ন দলটি।
জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব গতকাল গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পেলেও তাঁরা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। এ বিষয়ে কারণ উল্লেখ করে পাল্টা চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তে আমরা আপাতত যাইনি। আমরা আরও সময় নিতে চাই। আমরা এককভাবে বৈঠক করতে চাই।’
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যুগপৎ আন্দোলনে প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দল যুক্ত ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের জন্য ডজনখানেক আসন ছেড়ে দেয়। বর্তমানে সরকারে বিএনপির সঙ্গে রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) প্রতিনিধিরা।
যদিও নির্বাচনে শরিকদের অধিকাংশ প্রার্থী পরাজিত হন। নিজ নিজ প্রতীকে জয় পান মাত্র তিনজন। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। তাঁদের মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে এনডিএম ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হওয়া ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।