জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে একসময় যেসব লাইফবোট পড়ে থাকত পরিত্যক্ত সামগ্রী হিসেবে, এখন সেগুলোই হয়ে উঠেছে কোটি টাকার বাণিজ্যের উপকরণ। সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত এসব লাইফবোট সংগ্রহ, সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন জীবন পাচ্ছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। জাহাজের স্ক্র্যাপ থেকে বেরিয়ে আসা এসব বোট এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সমুদ্র, নদী, হাওর ও পর্যটন এলাকায়। মাছ ধরা, যাত্রী পরিবহন, পর্যটন ব্যবসা থেকে শুরু করে বন্যা ও দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব জলযান।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী, মাদাম বিবিরহাট, মদনহাট, কদমরসুল, শীতলপুর ও সোনাইছড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে লাইফবোটের জমজমাট বাজার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে এবং বিভিন্ন খালের মধ্যে সারি সারি ফাইবার লাইফবোট ও স্পিডবোট এখন এ এলাকার নতুন পরিচিতি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ী, জেলে, পর্যটন উদ্যোক্তা ও সাধারণ ক্রেতারা আসছেন এসব বোট কিনতে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফৌজদারহাট থেকে ছোট কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে ৩০ থেকে ৪০টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড। বিদেশ থেকে আমদানি করা বড় জাহাজ এসব ইয়ার্ডে ভাঙার সময় উদ্ধার করা হয় লাইফবোটগুলো। পরে টেন্ডারের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা এসব বোট সংগ্রহ করেন। পুরোনো কাঠামো পরীক্ষা করে দক্ষ কারিগররা মেরামত, ফাইবারের কাজ, রং করা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে এগুলোকে আবার ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন।
এসএল শিপ ইয়ার্ডের মালিক লোকমান হাকিম বলেন, জাহাজ ভাঙা কারখানায় আসা বড় জাহাজ থেকে প্রতিবছর শত শত ছোট, মাঝারি ও বড় স্পিডবোট পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীরা টেন্ডারের মাধ্যমে এসব বোট সংগ্রহ করে নতুনভাবে প্রস্তুত করে বিক্রি করেন। জাহাজ গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়লে নাবিকদের জীবন রক্ষার জন্য এসব লাইফবোট রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, একসময় জেলেরা গাছের তৈরি বড় নৌকা ব্যবহার করতেন। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফাইবার লাইফবোট ও স্পিডবোট। শক্তিশালী ইঞ্জিন বসিয়ে এসব বোট দিয়ে জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছেন। কাঠের নৌকার তুলনায় এগুলো বেশি নিরাপদ, দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী।
সীতাকুণ্ডের বাজারে আকার ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন দামের বোট পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ ফাইবার বোটের দাম ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ইঞ্জিনসহ মাঝারি আকারের লাইফবোট বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। আর উচ্চগতির রেসকিউ স্পিডবোটের দাম ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠের নৌকার তুলনায় ফাইবার লাইফবোটের স্থায়িত্ব বেশি এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। কাঠ পচে যাওয়া, নিয়মিত আলকাতরা দেওয়া কিংবা ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হয় না। এ কারণে উপকূলীয় এলাকার জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব বোটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বোট ব্যবসায়ী শওকত হোসেন বলেন, সীতাকুণ্ডের বোটের বাজার এখন আর শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে বোট কিনতে আসছেন। নোয়াখালী, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা এসব বোট নিয়ে যাচ্ছেন।
বাঁশবাড়িয়ার জেলে পাড়ার নিরঞ্জন ও উপেন্দ্র জলদাস বলেন, এ বোটে প্রয়োজন অনুযায়ী ইঞ্জিন বসিয়ে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা যায়। কাঠের নৌকার তুলনায় এটি অনেক বেশি নিরাপদ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব।
মৎস্য আহরণের পাশাপাশি পর্যটন খাতেও এসব লাইফবোটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন লেক, হ্রদ ও পর্যটন এলাকায় ছাদযুক্ত স্পিডবোট এখন পর্যটকদের চলাচল ও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। সিলেটের জাফলং থেকে আসা পর্যটন উদ্যোক্তা নুরে আলম বলেন, পর্যটন এলাকায় ব্যবহারের জন্য ভালো মানের ও সাশ্রয়ী বোটের খোঁজে সীতাকুণ্ডে এসেছি। এখন অনেক উদ্যোক্তা এখান থেকেই বোট সংগ্রহ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক মানের জাহাজে ব্যবহৃত এসব লাইফবোটে বিশেষ ভাসমান ব্যবস্থা থাকায় সহজে ডুবে যায় না। এ কারণে হাওর, নদী ও উপকূলীয় এলাকায় এগুলোকে নিরাপদ জলযান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ড থেকে ট্রাক ও ট্রেইলার যোগে এসব বোট যাচ্ছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল, কাপ্তাই হ্রদ, রাঙামাটি, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা ও পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
দুর্যোগকালেও এসব বোটের গুরুত্ব বাড়ছে। গত বছর ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময় সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকার এসব স্পিডবোট ব্যবহার করে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার, ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পের ফেলে দেওয়া সম্পদকে পুনর্ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই বাজার এখন সীতাকুণ্ডের নতুন অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে। একদিকে যেমন তৈরি হচ্ছে নতুন ব্যবসার সুযোগ, অন্যদিকে দেশের নৌ অর্থনীতি, মৎস্য খাত ও পর্যটন শিল্প পাচ্ছে নতুন গতি। প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সীতাকুণ্ডের লাইফবোটের এই বাজার ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বড় পুনর্ব্যবহৃত নৌযান সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।