ইতালিতে বৈধভাবে পাঠিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। সেই স্বপ্ন পূরণে কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ বসতভিটা বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে লাখ লাখ টাকা জোগাড় করে দিয়েছেন দালালদের হাতে। কিন্তু ইতালির বদলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে মানব পাচারকারী চক্রের কাছে জিম্মি করে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আদায় করা হয় আরও লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। এরপরও অনেকেই রয়েছেন নিখোঁজ।
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার এমন প্রতারণার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, স্থানীয় দালাল মুজিবার শেখ, মাহাবুল মুন্সী ও সামসু চৌকিদার ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে টাকা নেন। পরে তাদের কুনিয়া ইউনিয়নের আদিত্যপুর গ্রামের সুমন বেপারীর মাধ্যমে লিবিয়ায় পাঠিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাকা লেনদেনের একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি ভিডিওতে স্থানীয় দালাল মাহাবুল মুন্সীকে বলতে শোনা যায়, ‘সুমন ভাই, সাত লাখ টাকা হাতে পেয়েছি।’ অভিযোগ রয়েছে, ভিডিওতে মাহাবুব কাজীর পরিবারের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। শুধু একটি নয়, আরও কয়েকটি পরিবারের কাছ থেকে টাকা গ্রহণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই প্রতিবেদক মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব টুবিয়া গ্রামে গিয়ে তিন ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের প্রত্যেকের বর্ণনায় উঠে এসেছে একই ধরনের প্রতারণা, নির্যাতন এবং স্বজন হারানোর বেদনাদায়ক চিত্র। ২০২৫ সালের মার্চে ২২ লাখ টাকা খরচ করে ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন রাহাত তালুকদার। কয়েক দিন পর পরিবারের কাছে আসে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নির্যাতনের ভিডিও। এরপর মুক্তির জন্য দাবি করা হয় আরও ২৫ লাখ টাকা। রাহাতের মা মায়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল সব বিক্রি করেছি। কিন্তু জানি না সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে।’ একই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারের মা বিলকিস আরা বেগম বলেন, ‘নির্যাতনের ভিডিও পাওয়ার পর ছেলেকে ফেরানোর আশায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিয়েছি।
কিন্তু আজও সে নিখোঁজ।’ আরাফাত কাজীর বড় ভাই মাহাবুব কাজী বলেন, ‘ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে ৫৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তার পরও ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাইনি। প্রতিদিন একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকি।’ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে মানব পাচারের ঘটনা প্রকাশের পর অভিযুক্তরা উল্টো কয়েকটি পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আজিজ মুন্সী বলেন, দালালের প্রলোভনে পড়ে আমাদের ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক যুবক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ।
মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।’