সিলেট সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে মারাত্মক সব অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকের চালান। চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে জেলার পাঁচটি উপজেলার অন্তত ১০০টি পয়েন্ট (স্থান) ব্যবহার করছে অপরাধী চক্র। র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির বিশেষ অভিযানে এসব চালান ধরাও পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরকগুলো ভারতীয় বলে শনাক্ত হয়েছে। তবে সীমান্ত পার হওয়া এসব মারণাস্ত্রের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায় তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছে। মূল হোতারা বরাবরের মতোই রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারতের আসাম ও মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে সিলেটে অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং মাদক চোরাচালান বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্তত ১৩টি বড় বিস্ফোরকের চালান আটক করেছে, যা খনিতে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক।
গত ২৭ জুন জকিগঞ্জ উপজেলার সোনাসার এলাকার একটি ইটভাটায় র্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে ১১টি পাওয়ার জেল, ১১টি ডেটোনেটর ও একটি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার করে। এর দুই দিন আগে বড়লেখার তারাদরম সীমান্ত থেকে ৩টি পিস্তল, ৩ কেজি বিস্ফোরক ও ২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের রায়গঞ্জ থেকে ১৫টি পাওয়ার জেল ও ১৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়।
১৮ জুন রাতে গোলাপগঞ্জের উত্তর কানিশাইল এলাকার একটি ঝোপ থেকে ১টি ওয়ান শুটার গান, ৬টি পাওয়ার জেল, ৮টি ডেটোনেটর এবং পুলিশের লুণ্ঠিত দুটি টিয়ার শেল উদ্ধার করে র্যাব-৯। এ ছাড়া কানাইঘাটের ধর্মপুর থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪টি বিস্ফোরক ও ১৪টি ডেটোনেটর এবং ৩০ জানুয়ারি কুওরেরমাটি এলাকা থেকে ২৫টি বিস্ফোরক ও ২৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়।
২৯ জানুয়ারি গোয়াইনঘাটের সাতাইন এলাকা থেকে ৮টি বিস্ফোরক ও ৮টি ডেটোনেটর এবং ১৫ জানুয়ারি জৈন্তাপুরের কাটাগাঙ এলাকা থেকে ১৪টি বিস্ফোরক ও ১৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। এর আগে ছাতকের ছনবাড়ী সীমান্ত থেকেও বিস্ফোরকসহ একটি রিভলভার উদ্ধার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
২৮ জানুয়ারি রাতে তাহিরপুরের বারেকেরটিলা ওয়াচ টাওয়ারের পাশ থেকে ১ কেজি ১২৫ গ্রাম বিস্ফোরক ও ১৬টি ডেটোনেটর উদ্ধার হয়। ২৩ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকা থেকেও বেশ কিছু বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও সীমান্ত এলাকা থেকে এক দফায় ২৪টি বিস্ফোরক, ২৩টি ডেটোনেটর ও ৩টি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৯-এর সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত (জুলাই ২০২৬) সিলেট অঞ্চলে অন্তত ৩৫ কেজি ৭৩০ গ্রাম উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক এবং ২২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, উদ্ধার করা এসব বিস্ফোরকের পুরোটাই ভারতে উৎপাদিত। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি ৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড তাজা গুলি এবং ১৫৫টি এয়ারগানসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করেছে র্যাব। র্যাব সূত্র জানায়, উদ্ধার হওয়া এয়ারগানগুলোর সিংহভাগই ভারত থেকে চোরাইপথে আনা। এসব সাধারণ এয়ারগান বাংলাদেশে এনে কারিগরি পরিবর্তনের মাধ্যমে মারাত্মক মারণাস্ত্র ‘ওয়ান শুটার গান’-এ রূপান্তর করা হতো। সাম্প্রতিক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এরকম বেশ কয়েকটি রূপান্তরিত ওয়ান শুটার গানও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মো. আবদুল জব্বার জলিল বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে এই চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। র্যাব-৯ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী জানান, ভারত থেকে আসা বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে যারা ধরা পড়ে তারা বাহকমাত্র। ‘ক্রস বর্ডার’ চক্রের হোতাদের শনাক্ত করতে র্যাব কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীবাজার, বড়চালিয়া, গড়রগ্রাম, মাঝরগ্রাম, কাপনা, লোহারমহল, ভূইয়ারমোড়া, মাদারখাল, নরসিংহপুর, মাইজকান্দি, ছবড়িয়া, বাখরশাল, মানিকপুর, সেনাপতিরচক, ফেউয়া, ইছাপুর, সুলতানপুর, খাদিমান, গঙ্গাজল, সহিদাবাদ, ভক্তিপুর, পিল্লাকান্দী, আমলশীদ, সালেহপুর, উত্তরকুল, লাড়িগ্রাম, উত্তরভাগ, মিয়াগুল, বলরামেরচক, বিয়াবাইল, আইওর, বাল্লা, রসুলপুর, সোনানন্দপুর, দুধেরচক, শিবেরচক ও হাইওরচক সীমান্ত ব্যবহার করে থাকে চোরাকারবারিরা। এসব পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে মাদক ও চোরাইপণ্য আসে। লোহারমহল, ভূইয়ারমোড়া, কাপনা, মাদারখাল, মুন্সিবাজার, বিয়াবাইল, আইওর, উত্তরকুল, আমলশীদ, সুলতানপুর, সহিদাবাদ ও লক্ষ্মীবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের সঙ্গে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসে। কানাইঘাট উপজেলার দনা, কাড়াবাল্লা, লোভাছড়া, নুনছড়া, সোনাতনপুঞ্জি, বড়বন্দ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসে মাদক, গরু, মহিষ, সিগারেট, চিনি ও জিরা আসে। দনা ও লোভাছড়া দিয়ে অস্ত্র আসার খবরও সূত্র নিশ্চিত করেছে। দনা সীমান্ত মানব পাচারের জন্যও বেশ পরিচিত।
গোয়াইনঘাট উপজেলার নয়াবাজার লিডারবস্তি, সংগ্রামপুঞ্জি ও হাদারপাড় চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের এই এলাকা দিয়ে ভারত থেকে গরু, মহিষ, প্রসাধনী সামগ্রী, পিয়াজ, টম্যাটো, কম্বল, কাপড় এবং বিভিন্ন জাতের মাদক ঢুকে। সংগ্রামপুঞ্জি ও হাদারপাড় দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসার তথ্য রয়েছে বিভিন্ন সংস্থার কাছে। চোরাকারবারিরা সীমান্ত থেকে চোরাইপণ্য ও অস্ত্র-বিস্ফোরক নিয়ে হাদারপাড়-বঙ্গবীর, সালুটিকর-গোয়াইনঘাট, সোনারহাট-গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট-সারীঘাট, রাধানগর-গোয়াইনঘাট ও জাফলং-তামাবিল সড়ক ব্যবহার করে সিলেট শহরে আসে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বরমসিদ্ধিপুর, মাঝেরগাঁও, উৎমা, তুরং, ভোলাগঞ্জ, চিকাডহর ও ছনবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসে মাদকসহ নানারকম পণ্য।
জৈন্তাপুর উপজেলার মোকামবাড়ী, আলু বাগান, শান্তিমাইর জুম, মোকামপুঞ্জি, ছাগলখাউরি, বাননঘাট, শ্রীপুর চা-বাগান, মিনাটিলা, কাঁঠালবাড়ী, কেন্দ্রিবিল, ডিবির হাওড়, রাবারবাগান, লম্বাটিলা, ঘিলাতৈল, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা, করিমটিলা, কমলাবাড়ী, ভিরগোল, গোয়াবাড়ী, বাইরাখেল, হর্নি, মাঝেরবিল, কলিঞ্জিবাড়ী, জালিয়াখলা, নয়াগ্রাম, লালাখালের নুরুলের টিলা, অভিনাশ ও লাল মিয়ার টিলা, আফিফানগর, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গিবিল ও বালিদাঁড়া সীমান্ত ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। এসব পয়েন্ট দিয়ে মাদক, গরু, মহিষ, ভেড়া, ভারতীয় জিরা, কাপড়, কম্বল ও চকলেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য ভারত থেকে আসে। এর মধ্যে মোকামবাড়ী, আলুবাগান, শান্তিমাইর জুম ও মোকামপুঞ্জি দিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা মানব পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত।